ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ে সময় বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে অর্থমন্ত্রণালয়
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » পুঁজিবাজার

ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ে সময় বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে অর্থমন্ত্রণালয়

পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময় বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর প্রধানদের দেওয়া প্রস্তাব অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবটি অর্থমন্ত্রণালয় থেকে আগামীকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে। বিএসইসি সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

DSE-CSE-Logo

ডিএসই ও সিএসই লোগো

সোমবার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের এক প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দেখা করে এই প্রস্তাব জমা দেন। অর্থমন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুসারে প্রস্তাবটি আগামীকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে।

গত বৃহস্পতিবার ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানিভিত্তিক ৩০টি  ব্রোকার বিএসইসির কাছে চিঠি দিয়ে পুঁজিবাজারে বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময় বাড়িয়ে ২০২০ পর্যন্ত করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।

টানা দর পতন আর ব্রোকারহাউজগুলোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে বিএসইসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এম খায়রুল হোসেন আজ সোমবার সকালে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি মন্ত্রীকে জানান, ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের বাড়তি চাপে বাজারে এমন দরপতন হচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হলে বাজার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তখন মন্ত্রী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওই প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর পরামর্শ দেন।

এদিকে আজ বিকেলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে শীর্ষ ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের নিয়ে সভা করে বিএসইসি।

সেখানে বিএসইসি পর্যায়ক্রমে ব্রোকারহাউসের নতুন শাখা খোলার অনুমতি দেওয়া, মার্জিন রুলস, ১৯৯৯-এর ৩(৫) উপধারা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো ও লোকসানের বিপরীতে প্রভিশনিং স্থগিতের  মেয়াদ বাড়ানোর আশ্বাস দেয়।

বিএসইসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ঋণাত্মক ইক্যুইটির বিনিয়োগ হিসাবে লেনদেনের সুযোগ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। একইভাবে লোকসানের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখার বাধ্যবাধকতা শিথিলের মেয়াদও ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তারা। এছাড়া বৈঠকে ব্রোকারহাউজের নতুন শাখা খোলার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তিনটি বিষয়েই ইতিবাচক সাড়া দেয় বিএসইসি।

উল্লেখ, বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এর আগে বিএসইসি ঋণাত্মক ইক্যুইটির হিসাবে লেনদেন বন্ধ রাখা এবং লোকসানের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখার শর্ত শিথিল করলেও চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এর প্রেক্ষিতেই সময় বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।

বৈঠক বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান অর্থসূচককে বলেন, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আমরা শীর্ষস্থানীয় ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছি। কার্যকর বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর কিছু বিষয় বিএসইসির এখতিয়ারের মধ্যে আছে, কিছু বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিএসইসির করণীয় বিষয়গুলো আমরা বিবেচনা করবো। আর বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবো।

সাইফুর রহমান বলেন, ব্রোকারদের পক্ষ থেকে নেগেটিভ ইক্যুইটির হিসাবে লেনদেনের সুযোগ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। প্রভিশনিং স্থগিত রাখার মেয়াদেও একই সময় জানিয়েছে তারা। তাদের এ দাবি আমরা বিবেচনা করবো বলে জানিয়েছি।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ব্রোকাররা নতুন শাখার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আমরা তাদের বলেছি, বিএসইসি একটি দুটি করে শাখার অনুমোদন দিচ্ছে। বর্তমানে যাদের শাখা নেই, তাদের আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আমি তাদেরকে আশ্বাস দিয়েছি,  শাখা খোলার বিষয়ে তাদের দেওয়া প্রস্তাব  আমি কমিশকে জানাবো।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীদেরকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানিয়েছি। তারা এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আস্থা ফিরবে বলে বিশ্বাস করি।

প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা মনে করেন পুঁজিবাজারের চলমান পতন ঠেকাতে হলে এর বিকল্প কিছু নেই। পুঁজিবাজার ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে তাদের এই প্রস্তাব গ্রহণের অনুরোধ জানান তারা।

আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীদেরকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানিয়েছি। তারা এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আস্থা ফিরবে বলে বিশ্বাস করি

তাতে জানানো হয়, সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২১ জুলাইয়ের মধ্যে পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে হবে।

পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সময়সীমা ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোসহ তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির শেয়ার, কর্পোরেট বন্ড ও তালিকাভুক্ত শেয়ারে দীর্ঘমেয়াদি-কৌশলগত বিনিয়োগও ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার গণনা থেকে বাদ দেওয়া উচিত বলে মনে করে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিএসইসি সূত্র জানিয়েছিল, সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে।

বিএসইসিতে দেওয়া চিঠিতে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২০টি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাবে বলেছে, ২০১০ সালের পর থেকেই পুঁজিবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এসময় বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ আরোপের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ সীমিত হয়ে পড়ে। পুঁজিবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে নানা সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে পুঁজিবাজারে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়ক নীতির প্রয়োজন বলে মনে করে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রসঙ্গত, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট দায়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারত। তবে ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে বলা হয়, দায়ের পরিবর্তে ব্যাংক তার পরিশোধিত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইন্ড আর্নিংসের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবে। এতে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রায় ৭৫ শতাংশ কমানোর বাধ্যবাধকতা আরোপ হয়। অতিরিক্ত বিনিয়োগ আগামী বছরের ২১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে ব্যাংক ও এর সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অথচ এটি করতে হলে এ সময়ের মধ্যে ৬-৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করতে হবে। স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রির সম্ভাব্য এ চাপ বাজারে ভীতিকর অবস্থা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে এত শেয়ারের নিট ক্রেতা নেই পুঁজিবাজারে।

পুজিবাজারের ক্ষেত্রেও তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাহিরের বিনিয়োগকে এক্সপোজারে না ধরার অনুরোধ করেছেন তারা।

এদিকে, ব্যাংকের বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি ছাড়াও বিএসইসির প্রতি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের অনাদায়ী লোকসানের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া মার্জিন রুলস, ১৯৯৯-এর ৩(৫) উপধারা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে ব্রোকারেজ হাউজের নতুন শাখা খোলার অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে তারা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ