'এক্সপোজারের সংজ্ঞা বদলালে বদলে যাবে পুঁজিবাজার'
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » বিশেষ সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকারে এসআইবিএল সিকিউরিটিজের সিইও

‘এক্সপোজারের সংজ্ঞা বদলালে বদলে যাবে পুঁজিবাজার’

হুমায়ুন কবির সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) কোম্পানি সচিব। তিনি এসআইবিএল সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। হুমায়ুন কবির রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) অ্যাসোসিয়েট সদস্য। এসআইবিএলের শেয়ার বিভাগের কর্মকর্তা হিসাবে তার ক্যারিয়ার শুরু। ২০১২ সালে তিনি কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

SIBL-Humayun-Kabir

এসআইবিএলের সিইও হুমায়ুন কবির

অর্থসূচক: পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?

হুমায়ুন কবির: পুঁজিবাজার নিয়ে আলোচনা করতে হলে একটু পেছন থেকে করতে হবে। দুই এক দিনের উঠানামা নিয়ে কথা বললে হবে না। সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। ২০১০ সালে সূচিত ব্যাপক দর পতনের পরে বাজার প্রায় বিনিয়োগকারী শূন্য হয়ে আসছিল। এরপর গত তিন বছরে বিএসইসির তত্ত্বাবধানে অনেক ধরনের সংস্কার হয়েছে বাজারে। দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক হয়েছে। বিএসইসির অর্ডিন্যান্সের পরিবর্তন, অডিটরস প্যানেল করা, লিস্টিং রেগুলেশনে পরিবর্তন, কর্পোরেট গভর্নেন্স গাইডলাইন্স বাধ্যতামূলক করা, ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টি অ্যাক্ট পাশ হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাপক আইনি সংস্কার হয়েছে। এর ফলে এখন চাইলেই কেউ কারসাজি করে সহজে পার পেয়ে যাবে না। আবার এদের ফাঁদে পড়ে কোনো বিনিয়োগকারীকে সর্বস্ব হারাতে হবে না। শেয়ারের দাম উঠা-নামা করবে স্বাভাবিক নিয়মে। এর মধ্যে বিনিয়োগকারীর লাভ-লোকসান যা হবার হবে।

তবে নানা কারণে বাজারে এখন কিছুটা ধীরগতি। লেনদেন অনেক কমে এসেছে। আমাদের বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ দ্রুত মুনাফা চান। দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের মানসিকতা কম। এ কারণে এমন পরিস্থিতিতে তারা অস্থির হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে আগের বড় দরপতনের স্মৃতিও তাদের কাউকে কাউকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলে। এমন অবস্থায় এরা অস্থির হয়ে শেয়ার বিক্রি করেন বলে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে গিয়ে হোঁচট খায়।

অর্থসূচক: বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের কি উপায় আছে বলে আপনার মনে হয়?

হুমায়ুন কবির: বাজারের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টতা (Exposure) হিসাব করার পদ্ধতি ও সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা উচিত। এই এক্সপোজার থেকে লেনদেনঅযোগ্য সিকিউরিটিজকে (প্রেফারেন্স শেয়ার, বন্ড) বাইরে রাখা উচিত। প্রাইভেট কোম্পানি এবং তালিকা বহির্ভূত কোম্পানির সিকিউরিটিজকে এক্সপোজারে রাখা উচিত নয়। মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারহাউজের মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মূলধন ও বিনিয়োগকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগে অন্তর্ভূক্ত না করে, তা বাইরে রাখা উচিত।

এক্সপোজারের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। এতে বাজারে নতুন বিনিয়োগ আসবে। অন্যদিকে এখন যেসব ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগ রয়েছে, সেগুলোর বিনিয়োগও আইনি সীমার মধ্যে চলে আসবে। ফলে শেয়ার বিক্রি করে ওই বিনিয়োগ সমন্বয় করতে হবে না।

অর্থসূচক: এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের কী করা উচিত?

হুমায়ুন কবির: সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক নানাভাবে পুঁজিবাজারকে সহযোগিতা করতে পারে। ব্যাংকের এক্সপোজারের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে। অন্যদিকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয় করার যে বাধ্যবাধকতা আছে, সেটি শিথিল করা যেতে পারে। কয়েক বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলে শেয়ার বিক্রি ছাড়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয় হয়ে যাবে।

অর্থসূচক: ব্যাংকিং খাতে মালিক ও শীর্ষ নির্বাহীদের দুটি সংগঠন আছে। তারা কী এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে?

হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) অবশ্যই এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, গভর্নর মহোদয় এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারেন। অনুরোধ জানাতে পারেন পুঁজিবাজারে ব্যাংকের এক্সপোজার হিসাব করার সংজ্ঞা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা, অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়ানোর।

অর্থসূচক: অনেকে বলছেন বাজারে আসা বেশিরভাগ আইপিও দুর্বল মৌলের। এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই বিষয়ে আপনি কি বলবেন?

হুমায়ন কবির: দেখুন, বাজারে আইপিও আসা জরুরি। তবে কোম্পানির মৌল ভিত্তির বিষয়টাও বিবেচনায় রাখা দরকার। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদেরও দায়িত্ব আছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাচ্ছে বলেই যেকোনো মূল্যে শেয়ার কেনা উচিত না। দেখার বিষয় ২০ টাকার শেয়ার বিনিয়োগকারী কত টাকায় কিনছেন। যার মূল্য ২০ টাকা হওয়া উচিত সেটি যদি কোনো বিনিয়োগকারী ৬০ টাকায় কিনেন, তাহলে বড় লোকসানের ঝুঁকি তো থাকবেই। এ দায় তো অন্য কেউ নেবে না। এর জন্য বিএসইসিকে দোষও দেওয়া ঠিক নয়। কারণ যদি শেয়ারে দর ৬০ টাকা উঠার মতো হয়; তাহলে বিএসইসি আইপিওতে কোম্পানিটিকে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে শেয়ার বিক্রির অনুমোদন দিত। বিএসইসি অনুমোদন দেয় ১০ টাকায়; আমরা কিনি ৬০ টাকায়। এ দোষ কার?

অর্থসূচক: এটা কী আমাদের বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার অভাবের জন্য হচ্ছে?

হুমায়ুন কবির: আমি মনে করি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার অভাবের জন্যই এমন হচ্ছে।

অর্থসূচক: পুঁজিবাজার কয়েকবার ধসের মুখে পড়েছে। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে বাজার ধস থেকে বিনিয়োগকারীরা কি কিছু শিখেছে?

হুমায়ন কবির: আমি মনে করি, এই ধরনের ধস থেকে আমাদের বিনিয়োগকারীরা অনেক কিছু শিখেছে। কারণ ২০১০ সালের ধসের পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক আইন-কানুন পরিবর্তন করেছে। ১৯৯৬ সালে বাজার ধসের পেছনে যে কারণ ছিল, ২০১০ সালে তা ছিল না। আবার ২০১০ সালের অনেক সমস্যাই এখন বাজারে নেই। তবে এখনও বিনিয়োগকারীদের মাঝে গুজব ব্যাপকভাবে কাজ করে। আমরা যারা মার্কেটে বিনিয়োগ করি, তারা অনেকে না বুঝে বিনিয়োগ করে থাকি। বাজারের পরিস্থিতি, কোম্পানির বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করি না। বহু বিনিয়োগকারী রয়েছে যারা বন্ধুর কথায় বাজারে বিনিয়োগ করে লোকসান দেয়।

আমাদের বিনিয়োগকারীদের দেখা উচিত আমি যে কোম্পানির শেয়ার কিনেছি তা আদৌ ভালো কোম্পানির শেয়ার কি না। বাজারে কোম্পানিটির অবস্থান কোথায়। এসব কিছু বিবেচনা করে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনা উচিত বলে আমি মনে করি। আমি বিনিয়োগকারীদের বলব, আপনি যে কোম্পানির শেয়ার কিনতে চান; কেনার আগে সেই কোম্পানি ও শেয়ার সম্পর্কে একটু খোঁজ নিতে হবে। আগের কয়েকটি বছরে কেমন মুনাফা করেছে, লভ্যাংশের হার কেমন ছিল, আগামী দিনের সম্ভাবনা ইত্যাদি পর্যালোচনা করাও জরুরি।

অর্থসূচক: এসআইবিএল সিকিউরিটিজ সম্পর্কে কিছু বলেন?

হুমায়ুন কবির: সোস্যাল ইসলামি ব্যাংকের একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান হলো এসআইবিল সিকিউরিটিজ লিমিটেড। আমাদের কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১২৩ কোটি টাকা। সম্ভবত বাজারে ট্রেকহোল্ডার যারা আছে সবচেয়ে বেশি মূলধন আমাদের। ২০১২ সালে আমাদের এই কোম্পানির যাত্রা শুরু। তখন থেকেই কিন্তু আমরা ভালো করছি। একটি মাত্র অফিস দিয়ে ২০১৪ সালে আমরা প্রায় ৮ কোটি টাকা লাভ করেছি। এসআইবিএল ডিএসই ও সিএসই উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য। দীর্ঘ দিন শাখা অনুমোদন বন্ধ রাখার পর বিএসইসি আবার অনুমোদন দেওয়া শুরু করেছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে আমরা একটি শাখা চালু করেছি। এছাড়া আমাদের রহমান ম্যানশনে মূল অফিসের একটি বর্ধিত শাখা আছে।

অর্থসূচক: কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে বিনিয়োগকারী আপনার হাউজে এসে ট্রেড করবে। তাদের সুবিধার্থে কোনো বিষয় আছে কি?

হুমায়ুন কবির: এসআইবিএল সিকিউরিটিজ শুরু থেকেই অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছ। বিনিয়োগকারীদের জন্য আমাদের ভালো পরিবেশ আছে। আমরা সব সময়ই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাই। আমরা চেষ্টা করছি বিনিয়োগকারীদের সচেতন করার জন্য। আমাদের বাজার নিয়ে গবেষণাগার রয়েছে। এরা আমাদের বিনিয়োগকারীদেরকে সহযোগিতা করে থাকে। তবে যেটুকু আইনে কাভার করে। এখন বিনিয়োগকারীর সন্তুষ্টিই হলো আমাদের সাফল্য। বিনিয়োগকারীরা যদি আমাদের আচারণে সন্তুষ্ট হয় সেটা আমাদের বড় পাওয়া। আমার আবেদন থাকবে যারা এসআইবিএল সিকিউরিটিজের সেবা এখনও গ্রহণ করেনি। তারা আসেন আমাদের নির্বাহীরা প্রস্তুত আপনাদের সেবা দেওয়ার জন্য। অপেক্ষাকৃত কম কমিশনে আমরা এই সুবিধা বিনিয়োগকারীদের দিয়ে থাকি। মার্জিন সুবিধা আছে। দেখা যায় অনেক কোম্পানিতে লোকায়িত চার্জ থাকে; এসআইবিএল সিকিউরিটিজে এ ধরনের কোনো চার্জ নেই।

অর্থসূচক/জিইউ/

এই বিভাগের আরো সংবাদ