শৈলকুপায় ৬০২ মে. টন চাল-গম আত্মসাৎ করেছে সরকারদলীয়রা

jhinaida

Jinaidahঝিনাইদহের শৈলকুপার শাহী মসজিদের ঈদগাহ সংস্কারে ৫ মে. টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও ঈদগাহের কোনো কাজ করা হয়নি।

স্থানীয়রা বলছেন, গত ঈদের নামাজের সময় ঈদগাহ মাঠে পানি জমে যাওয়ায় ৫-৬ ভ্যান বালি দেওয়া হয়েছিল। আর এই কাজের বিনিময়ে উঠে গেছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬৫ টাকা মুল্যের ৫ মে.টন চাল।

একইভাবে উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে কাজীপাড়ায় কবরস্থান সংস্কারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল একই মুল্যের ৫ মে. টন চাল। সেখানেও কোনো কাজ করা হয়নি। এমনকি মনোহরপুর গ্রামের কাজীপাড়ার বলে কোনো পাড়া খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ওই গ্রামে একটি কাজী পরিবার আছে। যাদের পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে। সেখানেও কোনো কাজ হয়েছে বলে কেউ বলতে পারেননি। অথচ এই কাজীপাড়ার কবরস্থানকে ২০১০-১১ অর্থবছরে দক্ষিণপাড়া কবরস্থান দেখিয়ে নগদ আরও ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিল।  সে সময়ও কোনো কাজ হয়নি বলে জানিয়েছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। দু’টি প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন কাজীপাড়ার একমাত্র কাজী পরিবারের সন্তান সরোয়ার হোসেন কাজীর পুত্র কাজী নওরোজ। তিনি জানিয়েছেন ৫ মে. টন চাল পেয়ে জঙ্গল পরিষ্কার ও কিছু মাটির কাজ করা হয়েছে। পূর্বে বরাদ্দের বিষয়ে অফিসে খোঁজ না নিয়ে কিছুই বলা যাবে না।

এছাড়া, বরাদ্দ ছিল বিজুলিয়া পূর্বপাড়া মসজিদ সংস্কারের জন্য ৪ মে. টন চাল। পাশের হিতামপুর ঈদগাহ সংস্কারের জন্য ৩ মে. টন। বিজুলিয়া কুঠিবাড়ি সংস্কারে দেওয়া হয়েছে আরও ৩ মে. টন।

যেগুলোর কোন কাজ হয়নি বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী। কাজ হয়নি দুধস্বর জোয়ার্দ্দারপাড়া কবরস্থানের মেরামতের জন্য দুই কিস্তিতে নেওয়া ৭ মে. টন চাল ও গমের। এভাবে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে দুই কিস্তিতে বরাদ্দ দেওয়া প্রায় দুই কোটি টাকার ৬০২ মে. টন চাল ও গমের কোনো হদিস পাচ্ছেন না এলাকার সাধারণ মানুষ। তাদের বক্তব্য এই বিপুল পরিমাণ টাকার চাল-গম আত্মসাৎ করা হয়েছে।

শৈলকুপা প্রকল্প অফিসের একটি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সাংসদ সাবেক প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আব্দুল হাই গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২০৬টি প্রতিষ্ঠানকে ৬০২ মে. টন চাল ও গম বরাদ্দ দেন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রথম পর্যায়ে ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০২ মে. টন চাল ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০২টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০০ মে. টন গম বরাদ্দ দেন। যার সরকারি মূল্য (চালের) এক কোটি ১৮ হাজার ২৪৬ টাকা, আর গমের মূল্য ৮৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। মোট এক কোটি ৮৯ লাখ ২৪৬ টাকা। এই বিপুল পরিমাণ টাকার সরকারি মাল বরাদ্দ হলেও অধিকাংশ স্থানে কোনো কাজ না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ১ থেকে ৭ মে. টন পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক একটি প্রতিষ্ঠানে।

এলাকার সাধারণ মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি বেশ কিছু প্রকল্প এলাকা ঘুরে পাওয়া গেছে অভিযোগের সত্যতা। শাহী মসজিদের ঈদগাহে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোনো কাজ হয়নি। সেখানকার খাদেম মীর হাসান আলী জানান, প্রায় ২ লাখ টাকার চাল পেয়েছেন এটাই তারা জানেনই না। তিনি জানান, কোরবানীর ঈদের সময় ঈদগাহ মাঠে একটু পানি জমে গিয়েছিল। সে সময় ৫/৬ ভ্যান বালি দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া এক বছরের মধ্যে ঈদগাহে কোনো কাজ হয়নি। ওই কাজের বিপরীতে উঠে গেছে ৫ মে. টন চাল। এই প্রকল্পের সভাপতি রোকনুজ্জামান বাদশা জানান, তারা এই বরাদ্দ দিয়ে পাশের কবরস্থানে মাটি ভরাটের কাজ করেছন। অবশ্য স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কবরস্থানে মাটি ভরাট ব্যক্তিউদ্যোগে করে দিয়েছেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। যিনি ঢাকায় বসবাস করেন।

উপজেলার বিজুলিয়া গ্রামে গেলে একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের গ্রামের দুইটি প্রতিষ্ঠানে ৬ মে. টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার একটিরও কোনো কাজ করা হয়নি। বিজুলিয়া পূর্বপাড়া মসজিদ ও কুঠিবাড়ি সংষ্কারে ওই ৬ মে. টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গাড়াগঞ্জ বাজারের পাশে বিপ্লব মাস্টারের বাড়ি হতে সুলতান হুজুরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় মাটি ভরাটের জন্য দেওয়া হয়েছে ১ মে. টন চাল। সেখানেও কোনো কাজ হয়নি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ওই এলাকায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট রাস্তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
শৈলকুপা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এসকল তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে গ্রামের সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন মূলত এই বিপুল পরিমাণ অর্থের চাল-গম আত্মসাৎ করা হয়েছে। যারা প্রকল্প কমিটির সভাপতি হয়েছেন তারা বেশীর ভাগ সরকারি দলের লোকজন। অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এই চাল-গম উত্তোলন করা হয়েছে যা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িতরা কিছুই জানেন না।

এ ব্যাপারে শৈলকুপা উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা শেখ মো. রুবেল জানান, শাহী মসজিদে অনেক কাজ হয়েছে। ঈদগাহের সংস্কারের জন্য বরাদ্দ থাকলেও কাজ হয়েছে মসজিদে। এছাড়া মনোহরপুর কাজীপাড়ার কবরস্থানেও ইতোপূর্বে কিছু মাটির কাজ করা হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলো কাজ হয়েছে কিনা তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান। তিনি বলেন, অনেক সময় স্থানীয়রা এক কাজে বরাদ্দ চাল-গম বিক্রি করে অন্য কাজে ব্যয় করে থাকেন। আবার অনেক সময় টাকা জমা রেখে পরবর্তীতে আরেকটি বরাদ্দ পেলে একসাথে কাজ করেন। তারপরও অভিযোগ ওঠায় সবগুলো তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।