শামিমার জ্বলে ওঠা

Jhenidah Shamima Pic

Jhenidah Shamima Picস্বামীর অমানুষিক নির্যাতনের কারণে থমকে গিয়েছিল কিশোরী বধূ শামিমার জীবন। প্রবল আত্মবিশ্বাসী শামিমা সব নির্যাতন আর অপমানকে পরাস্ত করে আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলে উঠেছেন। সমাজের নির্যাতিত-অসহায় মানুষদেরকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। গড়ে তুলেছেন ঐক্য নারী কল্যাণ সংস্থা। নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন, অন্যদেরকে স্বাবলম্বী হতে পথ দেখিয়েছেন।

ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের রওশন আলীর মেয়ে শামিমা আক্তার। তার জ্বলে ওঠার কথা বলেছেন তিনি নিজেই।

১৯৯৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবার থেকেই আমাকে বিয়ে দেওয়া হয়। তখন আমি ১৩ বছরের কিশোরী। বিয়ে হয় আমিরুল ইসলামের সঙ্গে। আমিরুলের বয়স তখন ৩৫ বছর। স্বামীর বেপরোয়া উগ্র যৌন আচরণে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ি। কয়েক দিন পরই চলে আসি বাবার বাড়ি। কিন্তু আমার নিজের পরিবারই আমার কষ্ট বোঝেনি। পরিবারের চাপে পড়ে আবারও যেতে হয়েছে শ্বশুরবাড়ি। স্বামী নামের মানুষটা আমার কাছে রীতিমতো আতঙ্ক হয়ে ওঠে।

স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে আবারও বাবার বাড়ি চলে আসি। মা-বাবার কাছে বললাম স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা। এবার আমাকে শ্বশুরবাড়ি না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন মা-বাবা। এ খবর জানতে পেরে আমার স্বামী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে আমাকে অ্যাসিডে ঝলছে দেবে বলে হুমকি দেয়। সে তার হুমকি কার্যকর করে ১৯৯৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে।

ঘুমিয়েছিলাম আমি। সেই অবস্থায় অ্যাসিড ছুড়ে ঝলসে দেওয়া হলো আমার শরীর ও মুখ। ওই রাতেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় আমাকে ভর্তি করা হয় কোটচাঁদপুর হাসপাতালে। অ্যাসিডে পুড়ে মুখের চামড়া কুঁচকে চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। জমি বিক্রি করে চিকিৎসার জন্য আমাকে ভারতে নিয়ে গেল আমার পরিবার। অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থ হই। পরবর্তী সময়ে অ্যাসিড সারভাইভস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আরও চারবার অপারেশন করা হয়। এখন অনেকটা সুস্থ। চেহারাও কিছুটা আগের মতো হয়েছে। অসুস্থতা আর চিকিৎসার মধ্যেই কেটে যায় কয়েকটি বছর।

অলস বসে না থেকে কিছু একটা করার কথা ভাবি তখন। বাড়িতে বসেই সেলাইয়ের কাজ শুরু করি। আশপাশের দরিদ্র অসহায় নারীদের সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করি। সমাজের এসব অবহেলিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছি ‘ঐক্য নারী কল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি সংগঠন। ৪৩ সদস্য নিয়ে সংস্থাটি চলছে। এর মধ্যে ২৫ জনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। এ সংস্থার মাধ্যমে বাটিক, নকশিকাঁথা ও সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখান থেকে কাজ শিখে অনেকেই এখন উপার্জন করতে সক্ষম হচ্ছে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া লেখাপড়াটা আবার শুরু করেছি। ২০০৫ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় এসএসসি পাস করি। সারা দিন লেখাপড়া আর বিকেল ৪টার পর ঐক্য নারী কল্যাণ সংস্থার অফিস নিয়ে ভালো আছি।

সংস্থার ঘরে গত বছরের জুন থেকে একটি পাঠাগার চালু করেছি। এখানে দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা, যারা বইয়ের অভাবে লেখাপড়া করতে পারে না তারা এ পাঠাগারের বইয়ের সাহায্য নিয়ে লেখাপড়া করবে। ২০০৭ সালে নাসরিন স্মৃতি পদক পাই আমি। পদকের সঙ্গে নগদ ১০ হাজার টাকাও পাই।

তার ওপর এসিড নিক্ষেপ মামলাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে শামিমা ওই পাষণ্ডের প্রতি ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলেন, আসামির ৪৫ বছর জেল হয়েছিল। হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রচলিত আইনে এ বিচারে ফাঁক আছে, যা নারীর অধিকার আদায়ে বড় বাধা। তবে বাধা ডিঙ্গানোর সাহস পেয়ে গেছেন শামিমা। তাই এখন আর বসে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।