নিয়ন্ত্রণহীন ব্র্যাকের অনলাইন ব্যাংকিং

brac_bank
ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখার সাইনবোর্ড

brac_bankনিয়ন্ত্রণহীন ও অনিরাপদ অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে বেসরকারী খাতের ব্যাংক ব্যাংক লিমিটেড।এতে ব্যাংকটি থেকে সহজেই গ্রাহকের টাকা খোয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ব্র্যাক ব্যাংকের এমন দূর্বল অনলাইন ব্যবস্থাই ধরা পড়েছে। গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ব্যাংকটিকে চলতি বছরের মার্চের মধ্যে সম্পূর্ণ অটোমেটেড করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আর অটোমেটেড না হওয়া পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের লাগাম টেনে ধরার পরোক্ষ পরামর্শ দেওয়া হয়ছে। বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণহীন মোবাইল নম্বর বা সিম ভিত্তিক ও অনিরাপদ ইন্টারনেট ব্যাংকিং চালু রাখার ফলে কোন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায়ভার ব্র্যাক ব্যাংককেই নিতে হবে। যেসব গ্রাহক ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্যও নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে,ব্র্যাক ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে কয়েকজন গ্রাহক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তাদের টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ করেন। এরই প্রেক্ষিতে গত ২ ডিসেম্বর গভর্নর ড.আতিউর রহমান ব্র্যাক ব্যাংকের অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রম তদন্তের নির্দেশ দেন। কয়েক দফা তদন্তের পর দলটির কাছে ব্যাংকটির ইন্টারনেট ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে,ব্র্যাক ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণরূপে অটোমেটেড নয়। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট কিছু ত্রুটি আছে। এ কারণে গ্রাহক স্বার্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংকটির ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন অত্যাবশ্যক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্র্যাক ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং-এর পাসওয়ার্ড রিসেট করার প্রক্রিয়ায় দ্বিস্তরের সঠিকতা যাচাই করা হয় না। এক্ষেত্রে কল সেন্টারের একই ব্যক্তি তা যাচাই বাছাই করে। ফলে এ প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি থাকে। তাছাড়া ব্যাংকটির ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের প্রচলিত ব্যবস্থা মূলতঃ মোবাইল নম্বর বা সিম ভিত্তিক। এসকল মোবাইল নম্বর বা সিমে ব্যাংকটির কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সহজেই পূনঃস্থাপন বা রিপ্লেসমেন্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ব্যাংকটি যথা সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকগণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন। ব্যাংকটির গাফিলতির কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তাদের সম্পূর্ন টাকা ফেরত দিতে হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিবেদনে ব্যাংকটির ইন্টারনেট ব্যাংকিং কার্যক্রম সঠিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং হিসাব খোলার পর গ্রাহকের কিছু নিরাপত্তামূলক প্রশ্নাবলী এবং এর উত্তর ওয়েব বেসড সিস্টেমে গ্রাহককেই অন্তর্ভূক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এবং তথ্যগুলোকে ব্যাংকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।পরবর্তীতে এ তথ্য গ্রাহকের পাসওয়ার্ড রিসেট করার প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করতে হবে।

অতিরিক্ত ফেক্টরি অথেনটিকেশন এর জন্য ব্যাংকে ব্যবহৃত এসএমএস ওটিপি এর পরিবর্তে হার্ডওয়ার টোকেন অথবা সফটওয়ার টোকেনের ব্যবস্থা চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ব্যাংক হতে যাতে গ্রাহকের কোন তথ্য ব্যাংকের বাইরে না যেতে পারে সে বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে এ তদন্ত প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান অর্থসূচককে বলেন,  ইন্টারনেট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তিগত সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। তবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য।তিনি বলেন, ইন্টারনেট ব্যাংকিং একটি যৌথ প্রয়াস। এখানে যদি কোন জাল-জালিয়াতি সংগঠিত হয় তবে তার দায় ব্যাংকের পাশাপাশি গ্রাহকের উপরেও বর্তায়।তারপরেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ব্যাংকটিকে পুরোপুরি অটোমেটেড করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

ব্র্যাক ব্যাংকের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

গত ২ ডিসেম্বর ওবায়দুর রহমান নামের একজন গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তার অনলাইন ব্যাংকিং একাউন্ট থেকে ২৫ হাজার টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন ২৭ নভেম্বর ব্র্যাক ব্যাংক অভিনব কায়দায় তার অনলাইন ব্যাংকিং হিসাব থেকে ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ টাকা উত্তোলনের জন্য ব্র্যাক ব্যাংকে সংরক্ষিত তার ডাটাবেজ থেকে প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর,ই-মেইল, ন্যাশনাল আইডি এবং তার ব্যাংক হিসাব সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করে ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা তার এ টাকা আত্নসাৎ করেছে বলে তিনি জানান। তিনি ব্যাংকের কাছে পরের দিনই এর লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু ব্যাংক এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে তিনি তার অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করেন।

একইভাবে আবুবকর সিদ্দিক ও এবিএম মুসফিক সালেহীন তাদের ৪৫ হাজার টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ করেন। তারা ব্র্যাক ব্যাংকের কাছে এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করেন। কোন প্রতিকার না পেয়ে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের আশ্রয় নেন।

এছাড়া চট্টগ্রামে ব্র্যাক ব্যাংকের হলিশহর শাখার গ্রাহক মেসার্স সুমন এন্টারপ্রাইজের গ্রাহক সুমন কুমার দেব,গাজীপুর শাখার গ্রাহক খোরশেদ আলম, ঢাকা মিরপুর শাখার গ্রাহক রাকিবুল হাসান একই ভাবে অনলাইনের মাধ্যমে তাদের টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ করেন।