‘রানা প্লাজায় বেঁচে যাওয়া অলৌকিক শিশু’

miracle baby

miracle babyনাজমা ও জুয়েল উভয়ই কাজ করতেন সর্বগ্রাসী রানা প্লাজা ভবনের আলাদা পোশাক কারখানায়। জীবনকে টিকিয়ে রাখতে রাত দিন খাটতেন এই দম্পতি।

কিন্তু গত বছরে এপ্রিলে ভবন ধসে ১ হাজার ১২৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ভাগ্যক্রমে  নাজমা বেঁচে গেলেও মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পায়নি স্বামী জুয়েল।

নাজমা জানান, এ সময় জুনায়েদ আমার গর্ভে ছিল সাড়ে তিনমাস। আমি কাজ করছিলাম ৭ তলায় নিউ ওয়্যার লিমিটেডে। অন্যদিকে জুয়েল কাজ করছিল দ্বিতীয় তলায়। ভবন ধস শুরু হয় সকাল ঠিক ৯টার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবনটি দুমড়ে মুচড়ে পড়ে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। দুই ঘণ্টা পর যখন আমাকে উদ্ধারকর্মীরা টেনে বের করে তখন আমি জানতে পারলাম আমার গর্ভের বাচ্চা এখনও বেঁচে আছে। কিন্ত জুয়েল বেঁচে নেই।

তিনি বলেন, ঘটনার পাঁচ মাস পর জুনায়েদ পৃথিবীতে এলো। জুয়েল সব সময়  চাইতো আল্লাহ যেন আমাদের একটি পুত্র সন্তান দেয়। এখন জুয়েলের আশা আল্লাহ পূরণ করেছে। কিন্তু জুনায়েদ তো তার বাবাকে কখনও দেখতে পারবে না। তিনি জানান, পাঁচ মাস বয়সী জুনায়েদের চেহারা আমার চেয়ে সুন্দর, অবিকল তার বাবার মতো। তার নাক, মুখ, গড়ন আমাকে জুয়েলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

নাজমা বলেন, আমি যখন আমার সন্তানের দিকে তাকাই তখন আমার হৃদয় কেঁপে ওঠে। কারণ আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি। কিছুতেই আমার আবেগকে ধরে রাখতে পারি না। এখন এই ছোট জুনায়েদই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তারপরও এখন জুনায়েদের ভবিষ্যত নিয়ে আমি শঙ্কিত। কারণ মরণব্যাধী রানা প্লাজা ধস আমার সহায়তার সব সম্বলকে কেড়ে নিয়েছে।

ভবন ধসের কথা মনে করে তিনি বলছিলেন, ওইদিন কেউ কেউ কারখানার ভেতরে  যেতে চাচ্ছিল না, কারণ আগের দিন ফাটল দেখা দিয়েছিল, ওদের ধরে জোর করে খোঁয়াড়ে ঢোকানো হয়েছিল। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষগুলোর মাথার ওপরে পুরো ভবনটাই ভেঙে পড়ল। কোম্পানির ম্যানেজাররা বলেছিলেন, আজ যদি কাজ না করি তাহলে বেতন কমিয়ে দেওয়া হবে।

নাজমা আরও বলছিলেন, আমি সত্যিই ওইদিন কাজে আসতে চাইনি। কিন্তু এসেছিলাম আমার বকেয়া বেতনের কথা চিন্তা করে। এছাড়া আমার চাকরিও তো টিকিয়ে রাখতে হবে। এরপর প্রায় ৮ মাসে আমি ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকারের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ছাড়া এ পর্যন্ত মালিকদের কাছ থেকে আর কোনো টাকা পাইনি।

আমি আর কখনও পোশাক কারখানায় কাজ করতে চাই না জানিয়ে তিনি বলেন,  জুনায়েদকে আগে মানুষ করতে হবে। কারণ আমি মারা গেলে জুনায়েদকে কে দেখবে? আমি তার মধ্যে সবকিছু খুঁজে পাই।

এখন আমি যুক্তরাজ্যের চ্যারিটি অ্যাকশন এইডের সহায়তায় জুনায়েদকে নিয়ে বেঁচে আছি। সংস্থাটি আমার আর বাচ্চার জন্য এক লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে।

জুনায়েদ জন্মগ্রহণ করে ৫ নভেম্বর। নাজমা বলেন, আমি কখনও আমার ছেলেকে গার্মেন্টসে কাজ করতে দিব না। আমি তাকে লেখাপড়া করাতে চাই। আমি চাই, আমার দুঃসময়ে যারা অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে একসময় জুনায়েদও তাদের পাশে দাঁড়াবে।

তিনি আরও বলেন, এমন দুঃখ কষ্টে যেন আর কোনো পরিবারকে না পড়তে হয়। আর কারখানা মালিকদেরও এই দুঃসময় ভুলে যাওয়া উচিত নয়। বরং তাদের উচিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যাতে এমন ঘটনা চির জনমে আর না ঘটে।

সূত্র : মিরর

এসআর/এআর