গঠিত হচ্ছে ‘ইচ্ছার মন্ত্রিসভা’

Suronjit
Suronjit
ফাইল ছবি

আজ বিকেলে গঠিত হতে যাওয়া মন্ত্রিসভাকে ‘ইচ্ছার মন্ত্রিসভা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যমত সদস্য ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। রোববার সকালে অর্থসূচকের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি এ কথা বলেন।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা মন্ত্রিসভার সদস্য হতে পারেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সংবিধান পরিপন্থী, সংবিধান অনুসারে এটা হতে পারে না।’

তাহলে এই সরকার বা মন্ত্রিসভা কোয়ালিশন বা ভিন্ন কোনো ধরনের হচ্ছে কি না  সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এটা ইচ্ছা। তার যেমন ইচ্ছা হবে তেমন হবে। এটা ইচ্ছার সরকার, ইচ্ছার মন্ত্রিসভা।’

এ সময় তিনি ৭ম সংসদের দুই বিরোধী দলীয় সদস্যের মন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে আদালতে একটি মামলা হওয়ার প্রসঙ্গ হাজির করেন। সেই মামলার রায়ে এ ধরনের ঘটনাকে সংবিধান পরিপন্থী বলা হয়। ওই রায়ে বলা হয় যে সদস্যরা অন্য দলের মন্ত্রী হবেন তাদের সংসদ সদস্যপদ আর থাকবে না।

এই অবস্থায় একজন সংবিধান প্রণেতা হিসেবে আপনার মতামত কী এমনটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ আমাদের সংবিধান গণতান্ত্রিক, সে হিসেবে সবকিছু গণতান্ত্রিক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু গণতন্ত্রতো কেবল মৌখিক চর্চা না। এটা অনুধাবনেরও বিষয়। দৈনন্দিন চর্চার বিষয়।’

বর্তমানে দেশে গণতন্ত্রের সংকট আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের দিকে খেয়াল করেন, দেশে কেমন গণতন্ত্র চালু আছে তা বুঝতে পারবেন।’

এদিকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া সুরঞ্জিতের  নতুনদের কাছে কেমন প্রত্যাশা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রিসভা এখনও গঠিত হয়নি, যেটি ভূমিষ্ট হয়নি তা নিয়ে আমি মন্তব্য করতে পারবো না।’

মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দাওয়াত পেয়েছি সাবেক মন্ত্রী হিসেবে। তবে সংসদে কাজ থাকায় সেখানে যাওয়া হবে না।’

প্রসঙ্গত আজ বিকেলে দশম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রীরা বিকেল তিনটায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহন করবেন।

গতকাল শনিবার নতুন মন্ত্রীদের শপথ গ্রহনের বিষয়ে একটি গেজেট প্রকাশ করে বঙ্গভবন। বঙ্গভবন থেকে নতুন যারা মন্ত্রী হচ্ছেন তাদের ফোন করা হয়।

নতুন মন্ত্রীদের ওই তালিকায় দেখা যায়, দশম সংসদের বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন ওই তালিকায় রয়েছে।

অথচ বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে এভাবে সরকার গঠন করাটা সাংঘর্ষিক। কারণ জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল ও দলের অন্যতম সিনিয়র নেতা রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। পরে এসম্পর্কিত একটি গেজেটও প্রকাশিত হয়। এর ফলে সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী এটা নিশ্চিত যে, জাতীয় পার্টি সংসদে সরকারের বিরোধিতা করবে।

তবে সরকারটি যদি কোয়ালিশন সরকার হয় সেক্ষেত্র জাপার সদস্যদের মন্ত্রী হতে বাধা নেই। তবে ইতোমধ্যে যেহুতু বিরোধী দল হিসেবে জাপা সংসদে থাকছে সেহেতু দলটির সদস্যদের মন্ত্রী হওয়া সংবিধান পরিপন্থি।

এবিষয়ে সুরঞ্জিত ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে গঠিত সপ্তম সংসদের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। সে সময় বিএনপি থেকে জয়ী দুই জন সাংসদ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐক্যমতের সরকারে’ যোগ দিলে বিএনপি তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে। ওই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দুজন নির্বাচিত সাংসদ ঐকমত্যের সরকারে যোগ দেন। সাংসদ হাসিবুর রহমান স্বপন ও মোহাম্মদ আলাউদ্দিন যথাক্রমে সিরাজগঞ্জ-৭ ও রাজশাহী-৫ থেকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বিএনপির পক্ষে খন্দকার দেলোয়ার হোসেন আপিল বিভাগে আবেদন করেন যে, তারা আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বারা প্রলুব্ধ ও প্রভাবিত হয়ে যথাক্রমে ১৯৯৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ও ১৯৯৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়। এটা দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ১৯৯৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি উপমন্ত্রী হাসিবুর রহমান স্বপন ও প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের সংসদ সদস্যপদ শূন্য করার জন্য বিএনপি স্পিকারের কাছে চিঠি লেখে। চিঠিতে বিএনপি জানায়, সংসদীয় রীতিনীতি ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তারা জাতীয় ঐকমত্যের সরকারে যোগ দেয়। এটা সংবিধানের ৭০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজ ও রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বলে গণ্য হবে এবং সংবিধানে ৬৭ অনুচ্ছেদের ১ দফারই-উপ-দফার আওতায় তাদের পদ শূন্য বলে বিবেচিত হবে। বিএনপির ওই দুই সাংসদ যুক্তি দিয়েছিলেন যে তারা মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেননি। স্পিকার বিরোধী দলের আসন ২৯৯ থেকে পরিবর্তন করে স্বপনকে ট্রেজারি বেঞ্চের ২৬৪ নম্বর আসন দেন। আলাউদ্দিনের আসন ছিল বিরোধীদলীয় বেঞ্চে ১৮৬ নম্বরে, তাকে সরিয়ে আনা হয় ট্রেজারি বেঞ্চের ২৬২ নম্বরে। স্পিকার দুই মাসের বেশি সময় পর ১৯৯৮ সালের ২১ এপ্রিল রুলিং দেন যে, ওই দুই সাংসদের পদ শূন্য ঘোষিত হবে না। কারণ, তারা তাদের দল থেকে পদত্যাগ করেননি এবং সংসদে বিএনপির বিরুদ্ধে ভোটও দেননি।

বিচারপতি মোস্তাফা কামাল, বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি বিমলেন্দু বিকাশ রায় চৌধুরী, বিচারপতি এ এম মাহমুদুর রহমান, বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগ ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই রায় দেন যে, ৭০ অনুচ্ছেদে বিষয়টি একান্তভাবেই নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত এবং স্পিকারের কোনো সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ কর্তৃত্ব নেই তা ফয়সালা করার।

এই অবস্থায় যদি কোয়ালিশন সরকার গঠন না করা হয় এবং যদি কোনো সদস্য একটি দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে অন্য দলের গঠিত মন্ত্রিসভায় যোগ দেন, তাহলে সেক্রেটারি পার্লামেন্ট বনাম খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মামলায় আপিল বিভাগের রায়ের ‘রেশিও ডেসিডেন্ডি’ (সিদ্ধান্ত গ্রহণের যৌক্তিকতা) সম্পূর্ণরূপে প্রয়োগযোগ্য হবে। এবং সংশ্লিষ্ট সাংসদের আসন তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হয়ে যাবে।

তবে সে সময় এই ধরনের সংকট নিরসনের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের আছে বলে সমাধান দেয়।