ভালো লভ্যাংশ দেওয়া অনেক ব্যাংকের জন্য কঠিন হবে

EBL_MDআলী রেজা ইফতেখার এ সময়ের চৌকষ ব্যাংকারদের একজন। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ইবিএলের (ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড) ব্যবস্থাপনা পরিচালক  ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সম্প্রতি  তিনি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের ফোরাম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।দেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক গতি-প্রবাহ ও আগামি দিনের সম্ভাবনা, শেয়ারবাজার ইত্যাদি নানা ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন অর্থসূচকের সঙ্গে।সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন অর্থসূচক সম্পাদক জিয়াউর রহমান।

অর্থসূচক: বিদায়ী বছরে (২০১৩) দেশের অর্থনীতি নানা চড়াই-উতরাই পার করেছে। ব্যাংকিং খাতও এর বাইরে নয়। তো এ খাতের  জন্য কেমন ছিল বছরটি?

আ.রে. ইফতেখার: নানা কারণে ২০১৩ সালটি ব্যাংকিং খাতের জন্য সুখকর ছিল না।অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিক গতি না থাকলে ব্যাংকিং খাতও ভাল থাকতে পারে না। এই মন্দাবস্থার প্রতিফলন দেখা যায় ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক চিত্রে।

বছর শেষে পরিচলন মুনাফা যে চিত্র পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যাংকেরই মুনাফা কমেছে। এ খাতে পরিচলন মুনাফা কমেছে ২/৩ শতাংশের মত। এতে নীট মুনাফা অনেক কমে যাবে। কারণ পরিচলন মুনাফা যে হারে কমে, নীট মুনাফা কমে তারচেয়ে বেশি হারে। সাধারণভাবে পরিচালন মুনাফার ২০ শতাংশের মত নীট মুনাফা হয়। এবার ব্যাংকগুলোর নীট মুনাফা আগের বছরের চেয়ে ১২/১৩ শতাংশ কম হতে পারে। এতে অনেক ব্যাংকেরই লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাবে। কোনো কোনো ব্যাংকের জন্য ভাল লভ্যাংশ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

অর্থসূচক: কিন্তু আমরা তো দেখেছি, কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফায় প্রবৃদ্ধিও হয়েছে। তার মানে কেউ কেউ ভালও করেছে। তাই-না?

আ.রে.ইফতেখার: হ্যাঁ, কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। কিন্তু পরিচলন মুনাফা যতটা বেড়েছে দেখা যাচ্ছে, নিট মুনাফা কিন্তু ততটা বাড়বে না। তাছাড়া যতটুকু বেড়েছে, তা মূলত জেনেরিক গ্রোথ বা সহজাত প্রবৃদ্ধি। ব্যাংকে টাকা জমা রাখলেও কিন্তু বছর শেষে কিছু বাড়তি টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু তা অনেক ক্ষেত্রেই তা ওই টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হলে যে মুনাফা পাওয়া যেতো তা থেকে কম। তাই এ ধরনের প্রবৃদ্ধি কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়, গোল বা লক্ষ্যও নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান চায় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসায় বা মুনাফায় একটি ভাল প্রবৃদ্ধি করতে চায়। কিন্তু ২০১৩ সালে আমরা কিন্তু তেমনটি দেখিনি।

অর্থসূচক: এর পেছনে কি কি কারণ ছিল বলে মনে করেন।

আ.রে. ইফতেখার: অনেক কারণেই এমনটি হয়েছে। এ খাতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিচ্ছিন্ন ও অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে। আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে মূল্য অনেক বেশি উঠা-নামার কারণে দেশের অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী, সুস্পষ্টভাবে বলা যায় ভোগ্য পণ্যের বড় আমদানিকারক লোকসানে পড়েছেন। ফলে তারা ব্যাংকের পাওনা ঠিকমত পরিশোধ করতে পারেন নি। দেশে আবাসন খাতে স্থবিরতা নেমে আসায় রড ও আনুষাঙ্গিক পণ্যের চাহিদা পড়ে গেছে। এতে কমে গেছে এসব পণ্যের দাম। অন্যদিকে জাহাজের আন্তর্জাতিক বাজারেও চলছে মন্দা। ফলে জাহাজ নির্মাণ শিল্পও যথেষ্ট সঙ্কটে পড়ে। বছরের শেষভাগে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত তীব্র হয়ে উঠায় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যায়। সব কিছুরই প্রভাব পড়ে ব্যাংকিং খাতে।

অর্থসূচক : সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি বা প্রভিশনিংয়ের শর্ত শিথিল করেছে। এর কি সুফল পাবে ব্যাংকিং খাত?

আ. রে. ইফতেখার: সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই, তৈরি পোশাক ও কৃষি খাতে প্রভিশনিংয়ে কিছু ছাড় দিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাত একটু নি:শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। শর্ত শিথিলের কারণে অনেক ব্যাংক মরে না গিয়ে বেঁচে থাকবে। এর বেশি কিছু নয়। কারণ প্রভিশনিংয়ের সময় বাড়ানোয় সংকট পুরোপুরি কাটছে না, সঙ্কট সমাধানে কিছুটা বাড়তি সময় পাওয়া গেছে মাত্র। যে সঙ্কট এবারই হতে পারতো, সেটি হয়তো আগামি বছরে হবে, যদি না এর মধ্যে সব কিছু সামলে নিতে পারে ব্যাংকিং খাত।

অর্থসূচক: তাহলে ২০১৪ সালটি কেমন যেতে পারে ব্যাংকিং খাতের?

আ.এর. ইফতেখার:  যদি রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান না হয়, অস্থিরতা ও হরতাল-অবরোধের মত কর্মসূচি চলতে থাকে তাহলে ২০১৪ সালটি ব্যাংকিং খাতের জন্য আরও দু:সহ হয়ে উঠতে পারে। আর্থিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে। শ্রেণীকৃত ঋণের হার অনেক বেড়ে যেতে পারে। মুনাফা একেবারেই সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।

অর্থসূচক: খেলাপী ঋণ নিয়ে আশংকা করছেন কেন?EBL_MD_Editor

আ.রে.ইফতেখার: চার কারণে ২০১৪ সালে খেলাপী ঋণ সহনসীমার বাইরে চলে যেতে পারে। প্রথমত: রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকলে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটবে না, বরং তা আরও নাজুক হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশ ব্যাংক প্রভিশনিংয়ে যে ছাড় দিয়েছে তাতে বিদায়ী বছরে ব্যাংকগুলো একটু সাময়িক স্বস্তি পেলেও, গত বছরের ঝামেলা চলতি বছর বা ২০১৪ সালে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে ২০১৪ সালে কার্যত দুই বছরের প্রভিশনিং করতে হবে, যা ব্যাংকের মুনাফায় অনেক চাপ বাড়াবে। তৃতীয়ত: নানা কারণে অনেকগুলো খাত সত্যিকার অর্থেই বেশ খারাপ অবস্থায় পড়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পরিস্থিতির কারণে ভোগ্য পণ্য আমদানি, শিপ ব্রেকিং, শিপ বিল্ডিং, রড ও লোহাজাত পণ্য প্রস্তুত ইত্যাদি খাতের ব্যবসায়ীরা লোকসান দিয়েছেন। ফলে এদের পক্ষে সময়মত ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ বেশ দুরুহ। অন্যদিকে এমন পরিস্থিতিতে দুষ্টু ব্যবসায়ীদের তৎপরতাও বেশ বেড়ে যায়। প্রকৃত ক্ষতির মুখে না পড়েও অনেকে লোকসান বা ক্ষতির অজুহাত দেখিয়ে নানা সুবিধা নিতে চায়। কিস্তি শোধের বিষয়ে গড়িমসি করে।

অর্থসূচক: তাহলে তো ২০১৪ সালটি বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে।

আ. রে. ইফতেখার: হ্যাঁ, ২০১৪ সাল অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। অনেক দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রেণীকৃত ঋণের লাগাম টেনে রাখা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। প্রতিটি ঋণে মনিটরিং বাড়িয়ে, একটু নিবিড় পরিচর্যা করে কিস্তি পরিশোধ সচল রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। অন্যদিকে ইতোমধ্যে খেলাপী হয়ে পড়া ঋণ আদায়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া বেশ জরুরী। প্রয়োজনে এ ধরনের ঋণ আদায়ে কোনো এজেন্টের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

আর একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ হতে পারে বেশ বড় রক্ষা কবচ। এ ধরণের পরিস্থিতিতে ব্যবসা বা আয়ের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, আর এটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে। কিন্তু ব্যয়ের বিষয়টি ব্যাংকের নিজস্ব এখতিয়ারের মধ্যে থাকে। তাই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে একে পরিকল্পিতভাবে অনেকটা কাজে লাগানো যায়।

অর্থসূচক: ব্যাংকগুলো তো মুদ্রা বাজারেরর পাশাপাশি পুঁজিবাজরেরও প্লেয়ার। ২০০৭/০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাজারে এদের বিপুল বিনিয়োগ ছিল, অনেক মুনাফাও করেছে। বর্তমানে কি চিত্র?

আ. রে. ইফতেখার: আপনি ঠিকই বলেছেন, ২০১০ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজার থেকে বিপুল মুনাফা করেছে। আবার পরের তিন বছরে কিন্তু একইভাবে অনেক লোকসানও দিয়েছে। এখনও অনেক ব্যাংক পুঁজিবাজারে আছে। তবে বিনিয়োগের ধরণ বদলেছে। আগে ব্যাংক সরাসরি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতো। কিন্তু এটা ছিল বেশ ঝুঁকিপর্ণূ। কারণ বিনিয়োগকৃত টাকা আমানতকারীদের। এখন সরাসরি বিনিয়োগ না করে ব্যাংক তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগ করছে, যাতে আমানতকারীরা ঝুঁকিতে না পড়েন।

অর্থসূচক: পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

আ. রে. ইফতেখার: পুঁজিবাজারের দুটি অংশে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। প্রাইমারি মার্কেট কিন্তু নানা সঙ্কটের মধ্যেও বেশ চাঙা আছে। গত এক বছরে এমন কোনো আইপিও ছিল না, যাতে কয়েকগুণ বেশি আবেদন পড়েনি। সেকেন্ডারি মার্কেটে কিন্তু ভিন্ন চিত্র। সম্প্রতি বাজারে একটু গতি সঞ্চার হলেও বছরের বড় অংশ জুড়ে কিন্তু এ বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল। আমি মনে করি, বাজারের অনেক শেয়ারই অবমূল্যায়িত। তাই রাজনৈতিক অস্থিরতা কেটে গেলে পুঁজিবাজারে বেশ গতি সঞ্চার হবে। মূল্য সূচক (ডিএসইএক্স) পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার পর্যন্ত যেতে পারে, সে সুযোগ কিন্তু রয়েছে।

অর্থসূচক: রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এমনিতেই ব্যাংকিং খাত বেশ মন্দ সময় পার করেছে। তার উপর ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পে সহায়তার জন্য কিছু ছাড় দিতেও বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ধরনের চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আপনারা কি কোনো ধরনের নীতি সহায়তা চাইবেন সরকারের কাছে, বিশেষ করে করপোরেট করের হার কমানোর বিষয়ে?

আ. রে. ইফতেখার: অবশ্যই আমরা কিছু নীতি সহায়তা আশা করি। দেশে আমাদেরকে সর্বোচ্চ হারে কর দিতে হয়। তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কোনো ছাড় পাই না। আমরা এমন পরিস্থিতিতে করপোরেট কর কমানোর বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছি। তারা অর্থমন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

অর্থসূচক: শিল্প-বাণিজ্য, মুদ্রাবাজার, পুঁজিবাজার-সবই তো রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার। এ অস্থিরতা কেটে গেলে ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কতটা সময় লাগতে পারে?

আ. রে. ইফতেখার: কতটা সময় লাগবে বলা মুশকিল। তাছাড়া কতদিন পর অস্থিরতা পুরো কাটবে তার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে। এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে হয়তো সামলে উঠা সহজ হবে না। কিন্তু শিগগীরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে নি:সন্দেহে তা সামলে নিতে পারবে। অন্তর্গত শক্তিতে সামনে এগিয়ে যাবে আমাদের অর্থনীতি। ব্যাংকিং খাতও ঘুরে দাঁড়াবে। আর ছয় মাসের মধ্যেই এ পরিবর্তন উপলব্ধি করা যাবে।