সফলতা ও ব্যর্থতায় আইডিআরএ’র এক বছর পার

Idra+bia-Logo

Idra+bia-Logoঅনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে একটি বছর পার করলো বিমা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সমাপ্ত বছরে এই সংস্থাটির সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও কম ছিল না। আর ব্যর্থতার মূলে ছিল সংস্থাটির সদস্য ও চেয়ারম্যানের মধ্যে কাজের সমন্নয়ের অভাব।

বিমা খাতে সংস্কার আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তার সুফল মেলেনি। মূলধন সংকটের তীব্রতার মধ্যেও যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফলে বিমা সুবিধার মোটা অংকের বাড়তি আর্থিক চাপেও পড়তে হয়েছে এ খাতকে। স্বচ্ছতা আনতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরও  তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে গতানুগতিক ধারায়। এর পরও দুই দফায় নিতান্তই রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছে ১৬টি বিমা কোম্পানি।

অন্যদিকে, অবহেলিত এই খাতটিতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে প্রথম বারের মতো প্রণয়ন করা হয়েছে ‘বিমা নীতি-২০১৩।’ বিমা কোম্পানির দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাংগঠনিক কাঠামো, বিমা পলিসির বিদ্যমান উচ্চ প্রিমিয়াম রেট এবং পেশাগত বিমা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না থাকা, বিমা কোম্পানির কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব, কোম্পানিগুলোর আ্যাকচ্যুয়ারি না থাকার বেগ পোহাতে হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।

এদিকে, প্রতিষ্ঠানের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ, বিমা প্রতিষ্ঠানসমূহের ‘ব্যবসায় সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইডিআরের স্বাধীনতা না থাকা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে অনেকটাই থমকে গেছে এ খাতের প্রত্যাশিত অগ্রযাত্রা।

এরপরও বিমা খাত বিগত বছরের তুলনায় অনেকটা শৃঙ্খলার মধ্যে এসেছে বলে মনে করছেন বিমা সংশ্লিষ্টরা।

বিমা নীতি প্রণয়ন: ২০২১ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে বিমাখাতের অবদান পাঁচ শতাংশ উন্নীত করতে চায় সরকার। এজন্য জীবন ও স্বাস্থ্য বিমার ছাতার নিচে মোট জনগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশ নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে প্রস্তুত করা হয়েছে খসড়া জাতীয় বিমা নীতিমালা-২০১৩। প্রায় দুই বছর আগে এর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েক দফা স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থমন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হলে মন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণ বিমা কর্পোরেশন ও জীবন বিমা কর্পোরেশনের মতামত গ্রহণ করার পর তা চূড়ান্ত করা হয়।

বিমা প্রবিধানমালা: বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ সংক্রান্ত নতুন ধারা সংযোজন করে গত বছর ‘বিমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা-২০১৩’ এর গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। নতুন প্রবিধান অনুযায়ী আবেদনের সময় বিমা আইন ২০১০- এর ৮ ধারা এবং বিমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা -২০১৩ এর সব শর্ত পূরণ করতে হবে। আইন ও প্রবিধানের কোনো শর্ত বাদ পড়লে  কোনো কোম্পানিকে নিবন্ধন সনদ দেওয়া হবে না।

নতুন ১৬টি বিমা কোম্পানি : গত বছর দুই দফায় নতুন ১৬টি বিমা কোম্পানির অনুমোদন দিয়েছে আইডিআরএ। এর মধ্যে জুলাইয়ের ৪ তারিখ ১১টি ও ডিসেম্বরের ১৯ তারিখ দেওয়া হয় আরও পাঁচটি জীবন বিমা। সব মিলিয়ে ১৪টি জীবন বিমা কোম্পানি ও দুইটি সাধারণ বিমা ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন পেয়েছে। তবে বিমা ১৬টি কোম্পানিই রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিস্টরা বলছেন।

মুখ্য নির্বাহী নিয়োগে জটিলতা:

মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে যোগ্যতা সম্পন্ন লোকের অভাবে (এমডি) নতুন কোম্পানির এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিয়েছে । গত বছরের ৩ জানুয়ারি বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ সংক্রান্ত প্রবিধানমালা-২০১৩ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এতে এমডিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিষয়ে বলা হয়েছে, এমডি হতে হলে তাকে তিন বছরের  স্নাতক ও এক বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা চার বছরের  স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি থাকতে হবে।

পাশাপাশি কোনো বিমা কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা তার অব্যাবহিত নিম্নপদে ন্যূনতম তিন বছরের কর্ম-অভিজ্ঞতাসহ যে শ্রেণির বিমা কোম্পানিতে নিয়োগ লাভ করবেন, সে  শ্রেণির বিমা ব্যবসায় ন্যূনতম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে বিমা বিষয়ক উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের জন্য অভিজ্ঞতা শর্ত সাপেক্ষে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিথিল করা হবে। এছাড়া মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার বয়স ৪০ বছর থেকে ৬৭ বছর পর্যন্ত হতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমডি পদে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে এমন লোক খুঁজে পাচ্ছে না নতুন অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলো। আইডিআরের সূত্র আরও জানায়, নতুন এ প্রবিধান অনুসারে শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত শিথিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

১০ সালা কৌশল :

বিমাখাত সম্পৃক্ত সকল পর্যায়ের সাথে এক বৈঠকে আইডিআরএ জাতীয় বিমা নীতি ২০১৩ (খসড়া) এর বাস্তবায়নে তিন ধাপে দশ সালা কর্মকৌশলও গ্রহণ করেছে। ১০ বছর মেয়াদী কর্মকৌশলে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গতবছর (২০১৩) ও চলতি বছর  স্বল্পমেয়াদী, ২০১৫ থেকে  ২০১৭ সাল নাগাদ মধ্যমেয়াদী ও ২০১৮ খেকে ২০২২ সাল নাগাদ দীর্ঘমেয়াদী কর্মকৌশলের বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে।

ঝুলে আছে আইডিআর কাঠামো : আইডিআরের সাংগঠনিক কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) শক্তিশালী করে  বিমাখাতের তদারকি করার জন্য ১৭৯ জন কর্মকর্তার জন্য আবেদন করে আইডিআরএ। কিন্তু মন্ত্রণালয় দীর্ঘ আড়াই বছর পরে গত বছর  ৯৪ জন লোকবল সাপেক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন অনুমোদন দিয়েছে। তবে আইডিআরের সূত্রে জানা গেছে ১৭৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাঠামো প্রস্তাব করা হয় জুন মাসে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ৮৫টি পদ কর্তন করে ৯৪ জনের তালিকা চূড়ান্ত করায় আইডিআর থেকে নতুনভাবে অর্গানোগ্রাম অনুমোদনে জন্য আবেদন করা হয়েছে। এতে করে আবারও প্রক্রিয়াটি ঝুলে যায়।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের মার্চ মাসে বিমা আইন পাস হওয়ার পর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গঠিত হয়েছে।

আইডিআরে দ্বন্দ্ব : গত বছর উৎসব ভাতার  বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান  ও সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। জানা যায়, বিদায়ী বছরের ২৭ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগ থেকে আইডিআরএর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নেওয়া অতিরিক্ত উৎসব ভাতা ফেরত চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, আইডিআরএ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের চুক্তিপত্রের বাইরে কোনো ধরনের ভাতা পাওয়ার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সাল থেকে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের উৎসব ভাতা বাবদ নেওয়া অর্থ তাদের তিন মাসের বেতন থেকে সমন্বয়ের নির্দেশনা দেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মধ্যে কয়েক দফা চিঠি চালাচালি হয়। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের ফলে আইডিআরের কাজে নেমে আসে অস্থিরতা।

অনিয়ম তদারকিতে ব্যর্থতা:

বিমা খাত নিয়ন্ত্রণে বিগত বছরগুলোতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ বিমা খাতে বিশেষ মূল্যহার তুলে দেওয়া, নগদ টাকায় লেনদেন বন্ধ করা, বাকিতে ব্যবসা, সাধারণ বিমায় ১৫ শতাংশ ও জীবন বিমায় ৪৯ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ, জীবন বিমায় সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণসহ বিমা খাতের উন্নয়নে সার্ভিস রুলস ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। তবে এসব পদেক্ষেপের অধিকাংশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা যা বলেন : আইডিআরের সদস্য ফজলুল করীম অর্থসূচককে বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে অনিয়মের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকা বিমা খাতকে আইডিআরএ শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে বিভিন্ন নিয়ম কানুন প্রনয়ন করেছে। যা বিমা গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় খুবই ইতিবাচক। এর ফলে আগের থেকে এখন কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা বেড়েছে, দুর্নীতি কমেছে।

তিনি আরও বলেন, নতুন বছরে বিমা কোম্পানিগুলো নিয়ম  মেনে ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মতো ব্যবসা করলে বিমা খাতে একটি সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে। যা বিমা খাতের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির বলেন, সমাপ্ত বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ বিমা কোম্পানিগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইডিআরএ’র পদক্ষেপের কারণে বিমা খাতের অনিয়ম অনেকটা কমে এসেছে। আগামিতে যাতে বিমা শিল্প ও দেশের অর্থনৈতি চাকা শক্তিশালী করতে সহযোগিতা করবে।

জিইউ/এআর