শীতে খেঁজুরের রস ও গাছিদের ব্যস্ততা

khajur-notunkhobor.2হেমন্তকালে আকাশপানে তাকালে মনে হয় আকাশেও বুঝি কোনো ঋতু আছে। কেননা তখন প্রকৃতি সাজে এক অপরুপ সাজে। এ সময় চাঁদ, সূর্য, নক্ষত্র ও তারকারা সবাই নির্দ্বিদায় ও নিঃসংকোচে যেন সব আলো উজার করে দেয়। হেমন্তের বিকেলে হিমেল ঝিরঝিরি বাতাসে খেঁজুর গাছের তলায় গাছিরা যখন দাঁড়ায় আপন মনে তখন তাদের মন ভরে যায় অনাবিল আনন্দে। এ সময় শীতের সাথে খেঁজুর রসের থাকে এক নিবিড় সম্পর্ক।  খেঁজুর গাছ পরখ করে রস সংগ্রহের জন্য প্রস্ত্ততি নেয় তারা। বিশেষ কায়দায় কোমরে রশি বেঁধে খেঁজুর গাছের উপরে উঠে ধারাল কাঁচি দিয়ে বাদামী রংঙের কপালি বের করে। আর কিছুদিন পরই সেখান থেকে খেঁজুরের রস সংগ্রহ করে। গ্রামবাংলার প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে এই রস দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন রকমের পিঠা কিংবা পায়েস।

আর মাত্র কয়েকদিন। তারপরেই গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে পুরোদমে শুরু হবে পিঠা, পায়েস ও গুড় পাটালি তৈরির ধুম। গ্রামে গ্রামে খেঁজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলের গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও বাটালি গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যায়। খেঁজুর রসের পায়েস, রসে ভেজা পিঠা সহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারের তো কোনো জুড়ি নেই। আর শীতকালে খেঁজুর রসের স্বাদ কে না নিতে চায়। প্রতিবছর শীত আসলেই খেজুর রসের পিঠা, পায়েস দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের জন্য পড়ে যায় এক মহাধুম।

শীত আসতে না  আসতেই দক্ষিণাঞ্চল সহ বরিশালের বিভিন্ন উপজেলার গাছিরা খেঁজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করে। প্রাচীণ বাংলার ঐতিহ্য খেঁজুর গাছ আর গুড়ের জন্য একসময় এ অঞ্চল বিখ্যাত ছিল। অনেকে শখের বশে খেঁজুর গাছকে মধুবৃক্ষ বলে থাকে। শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে খেঁজুর গাছ কাটার প্রতিযোগীতা পড়ে যায় গাছিদের মধ্যে। তাই খেঁজুরের রস সংগ্রহের জন্য এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এসব এলাকার গাছিরা। খেঁজুর গাছ থেকে রস বের করার জন্য গাছিরা ইতোমধ্যে শুরু করছে প্রাথমিক পরিচর্যা। স্থানীয় ভাষায় এটাকে গাছছোলা বলা হয়ে থাকে। ছোলা গাছে এক সপ্তাহ পরেই আবার চাষ দিয়ে নল লাগানো হবে। খেজুর গাছে তিন স্তরে কাজ করার পর রস সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক পরিচর্যারত গাছ থেকে আর কিছুদিন পরেই খেজুর রস পাওয়া যাবে। ওই সময় খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহকারী গাছিদের প্রাণ ভরে উঠবে আনন্দে। যদিও আগের মত খেঁজুর গাছ না থাকায় এখন আর নেই সেই রমরমা অবস্থা।

খেঁজুরের গুড় থেকে এক সময় বাদামি চিনিও তৈরি করা হতো। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর মাত্র কয়েক দিন পরেই শুরু হবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক খেঁজুর গাছকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ। এক সময় গ্রাম্য জনপদের সাধারণ মানুষ শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে ঠান্ডা খেঁজুর রস না খেলে যেন দিনটাই মাটি হয়ে যেতো। কিন্তু ইট ভাটার আগ্রাসনের কারণে আগের তুলনায় খেঁজুর গাছের সংখ্যা দিন দিন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ইটভাটায় খেঁজুর গাছ পোড়ানো আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও ইটভাটার মালিকেরা ধ্বংস করে চলেছে খেঁজুর গাছ। গত কয়েক বছর ধরে ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে খেঁজুর গাছকে ব্যবহার করায় বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চল থেকে দ্রুত খেঁজুর গাছ ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। ফলে এ জনপদের মানুষ এখন খেঁজুর রসের মজার মজার খাবার থেকে অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে বন বিভাগ কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন না করলে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে খেঁজুর গাছ শুধু আরব্য উপনাস্যের গল্পে পরিণত হবে।

এএস