বদলে গেছে ভৈরবের অবহেলিত ঋষি সম্প্রদায়ের জীবন যাত্রার মান

bhirab_news_jan7বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ বদলে দিয়েছে ভৈরবের ঋষিপট্রির ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবন যাত্রার মান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান আর খাদ্যের মতো রাষ্ট্র স্বীকৃত মৌলিক অধিকার বঞ্চিত ঋষি সম্প্রদায়ের জীবন যাত্রার করুণ চিত্র আর চোখে পড়েনা। দীর্ঘ দিনের অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার ভৈরবের ঋষি সম্প্রদায়ের জন্য নানামুখি প্রকল্প গ্রহণ করে সংস্থাটি। তাদের ওইসব প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অধিকার বঞ্চিত ঋষিপট্রির মানুষ। আমূল পরিবর্তন হয়েছে তাদের নিত্যকার জীবন যাত্রায়।

কেয়ার বাংলাদেশের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের দরিদ্র আর অধিকার হারা মানুষদের উন্নয়নে কাজ করেছে স্থানীয় বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা সাদ বাংলাদেশ এবং ভৈরব পৌরসভার ইউজিআইআইপি’র বস্তি উন্নয়ন প্রকল্প।

জানা যায়, জাতিতে এরা মনিঋষি হলেও সাধারণত এদেরকে আখ্যায়িত করা হয় ঋষি সম্প্রদায় হিসেবে। বংশানুক্রমে এরা ছিল যাযাবর। ইহকাল থেকে পরকালকেই এ সম্প্রদায় বেশী গুরুত্ব দিত। ইশ্বর প্রেমে বিভোর এ ঋষি সম্প্রদায় আধ্যাত্মিক গান-বাজনা করে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। ইশ্বর প্রেমই মুখ্য, সংসার জীবন গৌণ। কালের আবর্তে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ মতবাদের পরিবর্তন ঘটতে থাকে ভারত বর্ষ দ্বি-খণ্ডিত হবার কিছুকাল পূর্ব থেকেই। তখন থেকেই এরা ছোট ছোট ভাগে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করে সংসারী হতে থাকে। সে প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে আজ থেকে প্রায় শত বছর আগে সিলেট, বি-বাড়িয়া, ময়মনসিংহ প্রভৃতি এলাকা থেকে বন্দর ও  বাণিজ্যনগরী ভৈরবে এ সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে। এলাকার বিভিন্ন পূজা-পার্বন, উৎসবে গান-বাজনা করে এদের জীবন চলতে থাকে।

কিন্তু যান্ত্রিক আধুনিক নগরসভ্যতার উৎকর্ষতায় ঋষি সম্প্রদায়ের গান-বাজনার তেমন কদর আর নেই বর্তমানে। অন্যদিকে এদের জনসংখ্যা দ্রুত হারে বাড়তে  থাকে  । প্রতিটি সক্ষম দম্পতির সংসারেরই চার পাঁচজন করে সন্তান। নিয়ন্ত্রিত পরিবার, সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি আধুনিক ব্যবস্থা এ সম্প্রদায়ের মাঝে সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। শত শত শিশু এখানে বেড়ে উঠলেও ছিলো না কোন শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান। অল্পসংখ্যক শিশু দূরে একটি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেও, দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্তই এদের বিদ্যা অর্জন শেষ হয়ে যেত। কারণ বিদ্যার দেবী সরস্বতীকে কাছে টানলে যে মা লক্ষ্মী বেঁকে বসবেন, ফলে পেটে যাবে না আহার। তাই ৭/৮ বছরেই ছেলে শিশুদের জুতা পলিশের বাক্স হাতে নিয়ে বের হতে হতো বাইরে।

কিন্তু ঋষিপট্রির সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশসহ তাদের সৌহার্দ্য কর্মসূচীর অধীনে সহযোগী আরো ২/৩টি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার নানামুখি প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে বদলে গেছে সেই দৃশ্যপট। কেবল আর্থিক নয়, পাল্টে গেছে মানবিক ও সামাজিক অবস্থাও। ভৈরব বাজারের মেঘনার পাড়ঘেঁষা ঋষিপট্রি এখন ছবির মতো একটি গ্রাম। রাস্তাঘাট, স্যানিটেশন, প্রতিরক্ষা দেয়াল-ঘাটলা, বিশুদ্ধ পানি, গ্রোথ সেন্টার, কমিউনিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানা রকম উন্নয়ন সাধন করেছে সংস্থাগুলি। এখানকার বাসিন্দাদের সচেতন করে তোলা হয়েছে এইসব মৌলিক বিষয়ে। বিভিন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ প্রদানের পর বিনা শর্তে (অফেরৎ যোগ্য) প্রতি পরিবারকে ৪ থেকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। এরা এখন ঝাড়ু, টিক্কা, জুতা, জাল, মোমবাতি, আচার, কারচুপি, পিঠা তৈরি, হাড়িপাতিল বিক্রি, মুদিমনোহারির দোকান, গবাদিপশু পালন, সেলাই, ব্লক-বুটিক, পার্লার ইত্যাদির ব্যবসা করে হয়েছেন স্বাবলম্বী।

কেয়ার বাংলাদেশ ভৈরব এরিয়া অফিস সূত্র জানায়, ২০০৬ সাল থেকে ভৈরবের ঋষি সম্প্রদায়ের মানবিক বিপর্যয় লাঘবে এখানে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। অল্পদিনের মধ্যে এগিয়ে আসে অন্যান্য সংস্থাগুলিও। তারা একদিকে অধিবাসিদের আর্থিক উন্নয়নে ১৩৫টি পরিবারের একজন করে পুরুষ ও মহিলাকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে স্ব-স্ব পেশায় ব্যবসার জন্য ৪ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়। অন্যদিকে কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টার (সিআরসি), আরসিসি ড্রেন, কমিউনিটি ল্যাট্রিন, রাস্তা, ফুটপাত, পাইপ লাইন ওয়াটার সাপ্লাই, আয়রন রিমুব্যাল প্লান্ট, ডিপ টিউবওয়েল ইত্যাদি অবকাঠামোগত নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। সংস্থাগুলির প্রত্যাশা- এমনি করে হতদরিদ্র এলাকায় উন্নয়নমূলক সরকারী-বেসরকারী সংস্থা পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন দেশ থেকে দারিদ্রতা চিরতরে বিদায় নেবে।

ইআর