উৎপাদনশীলতা না বাড়ায় নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

গার্মেন্টস কর্মপরিবেশ

গার্মেন্টস কর্মপরিবেশপোশাক শিল্পে শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা না বাড়ায় বর্ধিত মজুরি বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর উৎপাদন না বাড়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে পড়তে হচ্ছে বিপাকে। এর ফলে প্রথম মাসেই শ্রমিকদের বর্ধিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

গত ১ ডিসেম্বর থেকে পোশাক কর্মীদের ন্যূনতম বেতন কাঠামো ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়েছে। অথচ এই বেতন কাঠামো বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়েনি উৎপাদন, কমেনি ব্যাংক সুদের হার।

অন্য দেশগুলোতে যেখানে ডলারের মান বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশে কমছে। পোশাক পণ্যের কাঁচামাল আমদানি ও তৈরী পোশাকের রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে পোশাক শ্রমিকদের আরও দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য কর্মীদের কার্যকরি কোনো প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে পারেনি মালিকরা। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও আরও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তাছাড়া পোশাক পণ্যের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সার্বিক উন্নয়নে মালিকদের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে একটা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি ছিল। তবে সরকারিভাবে পোশাক শিল্পের স্বার্থে এমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

তবে মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট ও সুপারভাইজারদের ‘ক্যাশ কোর্স’ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে। যেখানে কারখানাগুলোর মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট ও সুপারভাইজাররা অংশ নেবেন। এছাড়া উৎপাদন বাড়াতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আনার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

এই অবস্থায় বর্ধিত মজুরি বাস্তবায়ন সত্যিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম অর্থসূচককে বলেন, শ্রমিকদের দক্ষতার লেভেল বাড়ানো পোশাক শিল্পের জন্য খুবই দরকার। তবে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিল্পের স্বার্থে সরকার এই বিষয়ে এগিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, চলমান অস্থিরতার কারণে পোশাকশিল্প ভেঙে পড়েছে। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ইতোমধ্যে তারা সরকারের নিকট নগদ অর্থ সহায়তাসহ উৎসে কর কমানোর দাবি জানিয়েছেন বলে জানান তিনি।

আইএলও, ম্যাকেঞ্জি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বরাত দিয়ে বিজিএমইএ বলছে, মজুরি ও উৎপাদনশীলতার আনুপাতিক হিসাবে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এখানে মজুরির পাশাপাশি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতাও কম। অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশগুলোতে মজুরি কিছুটা বেশি হলেও উচ্চ উৎপাদনশীলতার কারণে তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে।

বাংলাদেশ ন্যূনতম মজুরি ৬৯ ডলার, শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ৭৭ শতাংশ; ভারতে ন্যূনতম মজুরি ৭১ ডলার দিয়ে উৎপাদন করছে ৯২ শতাংশ, ভিয়েতনাম ন্যূনতম মজুরি ৭৮ ডলার দিয়ে উৎপাদন করছে ৯০ শতাংশ, কম্বোডিয়া ৮০ ডলার ন্যূনতম মজুরির বিপরীতে ৬৮ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। আবার পাকিস্তান নতুন জিএসপি সুবিধা পেয়ে ৮৮ শতাংশ উৎপাদন করছে ৭৯ ডলার দিয়ে।

বিশ্বজুড়ে যখন এ অবস্থা তখন বাংলাদেশে এই খাতটিতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় মজুরি বোর্ড ঘোষিত ৫ হাজার ৩০০ টাকা বেতন দেওয়াটা মালিকপক্ষের জন্য বেশ চাপের বলে মনে করছে বিজিএমইএ।

সংস্থাটি আরও বলছে, বাংলাদেশের মালিকরা ব্যাংক ঋণের হার পরিশোধ করছে ১৬-১৮ শতাংশ। সেখানে ভারত ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ, শ্রীলংকা ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ, ভিয়েতনাম ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, পাকিস্তান ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, কম্বোডিয়া ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ হারে সুদে ঋণ পাচ্ছে।

এছাড়া পোশাকপণ্যের  কাঁচামাল আমদানিতে আলোচ্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের খরচ অনেক বেশি হয় বলেও বিশ্ব ব্যাংকের বরাত দিয়ে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে ডলারের বিনিময় হারের কারণে বাংলাদেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানায় বিজিএমইএ। বাংলাদেশের বিনিময় হার যেখানে কমছে, সেখানে অন্য দেশে এটি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

উল্লেখ্য, গত ৪ নভেম্বর নিম্নতম মজুরি বোর্ড ৫ হাজার ৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে। নানা কারণ দেখিয়ে এটি গ্রহণে অসম্মতি জানালেও ১৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো মেনে নেয় বিজিএমইএ।

ঘোষিত মজুরি কাঠামোর বাস্তবায়ন চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে। যা শ্রমিকরা পাবেন জানুয়ারি মাসে। তবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি না পাওয়া ছাড়াও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পণ্য জাহাজীকরণ করা যাচ্ছে না। রপ্তানি আদেশ না পাওয়ায় বহু কারখানায় কাজ থাকছে না। পুলিশি পাহারায় পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেশি দিয়ে পণ্য পাঠানো হলেও তা হাই ওয়েতেই পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া নানা কারণে নভেম্বর থেকে কারখানাগুলোতে কাজ কম হওয়াকে দায়ী করছেন তারা।

ঘোষিত মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে বিজিএমইএ সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজীম বলেন, কারখানাগুলোতে কাজ নেই। উৎপাদন কম হওয়ার কারণে বেতন দিতে সমস্যা হবে। হরতাল ও অবরোধে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিনে কারখানাগুলো ৩৭ দিন  কর্ম দিবস হারিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এতে জানুয়ারি মাসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানা বেতন দিতে সমস্যা পড়বে। আর রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও প্রকট হলে ফেব্রুয়ারি মাসে ৩০ শতাংশের বেশি কারখানা সমস্যায় পড়বে বলে মনে করেন তিনি। তবে মালিকরা শ্রমিকদের বেতন দিতে প্রচেষ্টা চালাবেন বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহ-সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম অর্থসূচককে বলেন, কাজ না থাকার কারণে বিকেএমইএর ৮টি কারখানা ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে সংগঠনটির ৩০ শতাংশ কারখানা বন্ধের উপক্রম হবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, পোশাক কর্মীদের ন্যূনতম বেতন কাঠামো একতরফাভাবে বৃদ্ধি করে নিম্নতম মজুরি বোর্ড এই শিল্পকে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেও মনে করেন তিনি।

শ্রমিকপক্ষের সদস্য সিরাজুল ইসলাম রনি মনে করেন রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ঘোষিত মজুরিকাঠামো মালিকরা বাস্তবায়ন করবে। কারণ এই অস্থিরতা সাময়িক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মালিকরা আবার ভালো ব্যবসা করতে পারবেন। তাতে তারা লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলেও মনে করেন তিনি।

গত ৫ নভেম্বর ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ৫ হাজার ৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা অনুযায়ী, শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির মধ্যে মূল বেতন ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২০০ টাকা, বাসাভাড়া ১ হাজার ২৮০ টাকা, যাতায়াত ২০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ধরা হয়েছে ৩২০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য খরচ ধরা হয়েছে ৩০০ টাকা।

তবে এ সময় শ্রমিক সংগঠনগুলোও এ ঘোষিত  মজুরি কাঠামো প্রত্যাখ্যান করে। এ সময় দাবিদাওয়া দিয়ে  নানা কর্মসূচিরও ঘোষণা দেয় তারা।

এর ১৫ দিন পরে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ করা হলে আবার তারা তা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এরই মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হবে বলে মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়।

তবে মালিকপক্ষের যুক্তি সরকারিভাবে যদি এই খাতের শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা না হয় তাহলে নতুন কাঠামোয় বেতন দিতে গিয়ে কারখানা বন্ধের উপক্রম হবে।