আন্দোলন-অনশনেও চালু হয়নি খুলনার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি

dada match

dada matchশিল্পনগরী খুলনার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের ২০১৩ সাল কেটেছে আন্দোলন, সংগ্রাম ও অনশনের মধ্য দিয়ে। অভাব অনটন আর না পাওয়ার যন্ত্রণা ছিল তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

শ্রমিকরা জানান, বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ফ্যাক্টরী চালুর আশায় আরও একটি বছর কেটে গেলেও চালু হয় নি খুলনার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরী। ফলে তাদের পারিবারিক জীবনে যেমন বিপর্যয় নেমে এসেছে তেমনি অর্থ সঙ্কটে অনেকেই ঋণের জালে আটকে গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি থাকা সত্বেও চালু হয় নি খুলনা দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরী। শ্রমিকরা রাজপথে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম এমনকি অনশন করেও কোনো লাভ হয় নি। ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠান ‘ভাইয়া গ্রুপ’ সরকার বা শ্রমিকদের সাথে কোনো ধরণের আলোচনা না করে ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে উৎপাদন ও ১৮ আগস্ট দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরী বন্ধ করে দিয়ে সকল শ্রমিক-কর্মচারীদেরকে টারমিনেশন করে। এরপর থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা মিলটি বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চালু ও শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের জন্য আন্দোলন শুরু করে। ২০১১ সালের ৫ মার্চ খালিশপুরে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্যাক্টরী চালুর ঘোষণা দেন। একই বছর ২৩ মার্চ শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে খুলনা জেলা প্রশাসন ফ্যাক্টরীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বুঝে নেন।

এ ঘটনার পর সরকারি উদ্যোগ ব্যাহত করতে মাঠে নামে ইজারা গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ‘ভাইয়া গ্রুপ’। তাদের না জানিয়ে সরকার ফ্যাক্টরিটি নিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে অভিযোগ করে ওই বছর ২৯ মার্চ হাইকোর্টের ১৫ নং বেঞ্চে একটি রীট দাখিল করেন। শুনানী শেষে উচ্চ আদালত গত ১৫ মে রিটটি খারিজ করে দেয়। পরবর্তীতে তারা আবার এ আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপিল করে। এ ঘটনার পর থেকে মিলটি চালুর ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে স্থবিরতা দেখা দেয়।  ১১ আগস্ট আদালত ‘ভাইয়া গ্রুপের’ আপিল খারিজ করে দেয়। কিন্তু রায়ের পর সরকারিভাবে ফ্যাক্টরিটি পুনরায় চালু নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক চিঠি চালাচালি হলেও কার্যত কোনো ফল হয় নি। ফ্যাক্টরীর শ্রমিকরাও কয়েক দফা আন্দোলন করেছেন। অপরদিকে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া জেলা প্রশাসন ২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন খুলনা জেলা প্রশাসক মোঃ জমশের আহাম্মদ খন্দকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরীর ৩৮ জন নিরাপত্তা প্রহরীর বেতন ও মিলের নিরাপত্তা সম্পর্কিত পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে ১১ মাসের বেতন বাবদ ১১ লাখ টাকা জরুরী ভিত্তিতে প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু ওই জরুরী নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিতরা কোনো বেতন-মজুরী পান নি। এ অবস্থায় সাবেক জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন শিল্প সচিবকে ২০১২ সালের ১৭ জুলাই স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ফ্যাক্টরির নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। পরবর্তীতে ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-র ফ্যাক্টরি চালু ও শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন। ওই স্মারকলিপি গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর শিল্প সচিবকে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু তারপরও এ মিলের শ্রমিকদের আশাহতের আরেকটি বছর পার হয়েছে।

দাদা ম্যাচ ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন দিলখোশ মিয়া অর্থসূচককে বলেন, ফ্যাক্টরিটি চালুর দাবিতে আমরা অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও আমরা কোনো ফল পাচ্ছি না।

ক্ষোভের সাথে তিনি বলেন, দীর্ঘ তিন বছরে মিলটির হাজার হাজার শ্রমিকদের জীবনের সকল উৎসব বিষাদে পরিণত হয়েছে। আমাদের কোনো নববর্ষ নেই। আমাদের জন্য সব দিনই কষ্টের।

উল্লেখ্য, খুলনা মহানগরীর রূপসা নদীর তীরে ১৯৫৬ সালে ১৮ একর জমির উপর সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ নির্ভর দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল।