রাজনৈতিক অস্থিরতায় পোশাক খাতের ক্ষতি বাড়ছে

পোশাক কারখানা
ছবি: ফাইল ছবি

গার্মেন্টসচলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল-অবরোধ ও সহিংসতার তীব্র প্রভাব বেড়েই চলেছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে।কোনও ক্রমেই যেন থামছেনা এই অস্তিরতা। প্রতিনিয়তই বাড়ছে এ খাতের ক্ষতির পরিমাণ। বাতিল হচ্ছে অর্ডার। নাশকতার আগুনে পুড়ছে পোশাক বোঝাই ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যান।

দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, হরতাল অবরোধে পোশাক শিল্পের সাপ্লাই চেইন ধসে পড়েছে। ক্রেতাদের কাছে আস্থা কমে যাওয়াসহ বিশ্ববাজরে শিল্পের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। চলতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিনে ৩৭‌ কর্মদিবসই চলমান অস্থিরতার কবলে পড়েছে। তার মধ্যে অবরোধ ২৬ দিন, হরতাল ৮ দিন ও ৩ দিন ছিল পরিবহন ধর্মঘট।

বিজিএমইএ বলছে, একদিন হরতাল কিংবা অবরোধে উৎপাদন ব্যহত হয় ২৫০ কোটি টাকা। চলতি বছরের শেষ দুই মাসে এই শিল্পের ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

ডিসেম্বর মাসের ৩০ দিনে আলোচিত কারখানাগুলোর ১৫৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার ১০১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্ডার বাতিল, মূল্য ছাড়, বিমানে পণ্য পরিবহণের জন্য বাড়তি মাশুল, জাহাজীকরণ বিলম্ব ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়জনিত ক্ষতি।

এখন পর্যন্ত যে ৩৬ কারখানা ক্ষতির রিপোর্ট করেছে বিজিএমইতে সেগুলো হচ্ছে-গার্মেন্ট এক্সপোর্ট ভিলেজ, রাতুল অ্যাপারেলস, ডিভাইন ফ্যাশন, নিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, সাউথইস্ট স্যুয়েটার, শাহেদ ফ্যাশন, শাহেদ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ, পি অ্যান্ড ও অ্যাটায়ারস, মার্ক মুড, লিরিক অ্যাপারেলস, আমিন ফ্যাব্রিক, কেজি গার্মেন্টস, ম্যানভিল স্টাইল, নোমান ফ্যাশন, সাদ-সান অ্যাপারেলস, লিরিক ইন্ডাস্ট্রিজ,  বাংলা পোশাক, এসকেএল অ্যাপারেলস, সেভেন স্টার স্যুয়েটার, ডটকম স্যুয়েটার, ফ্যাশন ২০০০ লিমিটেড, বিএলপি ওয়ার্ম ফ্যাশন, স্পেস স্যুয়েটার ও ফ্যাম স্যুয়েটার, এবিসি নীট কম্পোজিট, এসএমএইচ নিউ জেনারেশন, এসএএম সুয়েটার, সুফি অ্যাপেরালস, প্যানটালুন ডিজাইন, প্যানটালুন জিন্স, ব্রাইটেক্সস স্পোর্টস, প্যানউইন গার্মেন্টস, প্যানউইন ডিজাইন, ইসলাম গার্মেন্টস ও ইসলাম নীট ডিজাইন লিমিটেড।

এ সম্পর্কে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতা শহীদুল্লাহ আজিম চলমান রাজনৈতিক সংকট, পোশাক শিল্পে অস্থিরতা, রপ্তানি আদেশ বাতিলসহ পণ্য পরিবহন সংকটকে দায়ী করেন।

তিনি বলেন, সামগ্রিক অস্থিরতায় কারখানা মালিকেরা কাজের অর্ডার পাচ্ছেন না। এ সময়ের মধ্যে ৩৬ টি কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে।তার দেওয়া তথ্যমতে, যার পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৩ মার্কিন ডলার।

আর রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৭ মার্কিন ডলার, সময় মতো মূল্য ছাড় বাবদ জরিমানা গুনতে হচ্ছে ১৭ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮ মার্কিন ডলার। আবার আকাশ পথে পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ মার্কিন ডলার। জাহাজী করণে বিলম্ব মাশুল ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪১০ মার্কিন ডলার, ভাংচুর-নৈরাজ্যে ২৬ লাখ ৪ হাজার ৭৭৫ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন আজীম।

তিনি বলেন, দেশে চলমান অস্থিতিশীল রাজনীতির কারণে কারখানা মালিকরা তাদের পণ্য পরিবহন করতে পারছে না। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে ব্যবসার পরিধি কমিয়ে আনছে। ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশের প্রতি নজর দিচ্ছেন তারা। ফলে ক্রমেই রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, এক সপ্তাহে ঢাক-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে ৫ হাজারের বেশি ট্রাক/কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন করতে পারে। অবরোধের মধ্যে সেখানে ২ হাজার ট্রাক/কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন করতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে কারখানাগুলোতে পণ্য আটকে থাকছে।

আবার পণ্যবাহী ট্রাক/কাভার্ডভ্যানের চালকেরা অবরোধের কারণে নিরাপত্তার ভয়ে গাড়ি চালাতে চাচ্ছেন না। তবে ওই সময়ে পুলিশি নিরাপত্তায় কিছু পণ্য পরিবহন করলেও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আবার তাতে হচ্ছে কয়েকগুন বাড়তি খরচ।

১০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া পুলিশি নিরাপত্তায় ৩৫ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে মালিকদের। এতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুন বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ মালিকদের।আবার পোশাক-কারখানাগুলোতে নাশকতার কারণে উদ্বিগ্ন মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ৩০ নভেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশের পাহারায় ২০৩৪৩ টি পরিবহন চলাচল করেছে। তার মধ্যে ১৬৬৪৮ টি ট্রাক/কাভার্ডভ্যান পোশাক পণ্য পরিবহন করেছে। তৈরি পোশাক নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গিয়েছে ৯৮৯০ টি ট্রাক/কাভার্ডভ্যান।আর চট্টগ্রাম থেকে পোশাক পণ্যের কাঁচামাল নিয়ে ঢাকাতে এসেছে ৬৭৫৮টি ট্রাক/কাভার্ডভ্যান।

বিকেএমইএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চলমান সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিকেএমইএভুক্ত সদস্যদের কারখানায় হরতাল-অবরোধে অন্তত ৩০ শতাংশ রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে। উৎপাদন আদেশ না পাওয়ায় মালিকেরা শ্রমিকদের কাজ দিতে পারছেন না। কাজ না থাকায় গতি হারিয়ে ফেলতে বসেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন বাংলাদেশ থেকে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ক্রেতারা ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে ঝুঁকছে বলে জানান তিনি।

এদিকে পোশাক মালিকেরা বলছেন, বছরের এই সময়টাতে সব চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। বড় দিনকে সামনে রেখে রপ্তানির ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তবে চলমান পরিস্থিতির কারণে এবার শিল্পে বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।ভরা মৌসুমে কাজ হারাচ্ছেন কারখানা মালিকেরা।

মালিকেরা জানান, পুলিশি পাহারায় পণ্য পরিবহন হলেও চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে মালবাহী ট্রাক আগুনে পুড়ে যাওয়ায় চলাচল বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এতে করে আরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।