ভৈরবে জলাভূমি ভরাটের মহোৎসব চলছে

Bhairab Khal-Bil

Bhairab Khal-Bilনিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ভরাট হচ্ছে ভৈরব পৌর শহরের জলাভূমি-খাল, বিল, ডোবা-পুকুর। ওইসব জলাভূমি দখল হয়ে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। নির্বিচারে জলাভূমি ভরাটের ফলে পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। পানি নিষ্কাশনে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। গত তিন বছরে ভৈরব পৌরশহরের কমপক্ষে ৪০টি জলাভূমি ভরাট হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও পৌর শহরের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন স্থানে ছিল ছোট-বড় অসংখ্য জলাভূমি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ছাড়াও এসব জলাভূমির জল ব্যবহার করা হতো চাষাবাদসহ নানা প্রয়োজনে। এইসব জলাভূমি থেকে আহরিত হতো বিপুল পরিমাণ মৎস্য সম্পদ। কিন্তু সেই অবস্থা এখন আর নেই। সেসব জলাভূমির ওপর এখন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই ওইসব জায়গায় একসময় জলাভূমি ছিল। পৌর এলাকার জমির দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় জলাভূমির মালিকরা সেগুলো ভরাট করে আবাস ভূমি বানাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কেবল ব্যক্তি মালিকানা জলাভূমিই নয়, বাদ যাচ্ছে না সরকারি খাস জলাভূমিও। কৃষি লীজ দেখিয়ে ভরাট করে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বাণিজ্যিক ভবন।

ভৈরব পৌরসভা সূত্র জানায়, ওইসব জলাভূমি ভরাটে নেওয়া হয় নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি।

ইতোমধ্যে ভরাট করা হয়েছে ভৈরব পৌর শহর ও শহরতলীর মনামরা খাল, বাজার এলাকার রাণীর পুকুর, কাঠপট্রির মেঘনার খাড়ি, পলতাকান্দার খাল, সাতমুখীর বিল, গাছতলাঘাটের খাল, আমলাপাড়ার খাল, পঞ্চবটীর খাল, নিউ টাউন, নাটালের পেছনের বিল, আনোয়ারা জেনারেল হাসপাতালের পিছনের ডোবা।

ভৈরবের ইতিহাস থেকে জানা গেছে, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলে জেগে উঠা এক সময়ের চরাঞ্চল উলুকান্দির চরে ১৮ শতকের শুরুতে মানুষের বসতি শুরু হয়। ওই শতকের মাঝামাঝি সময়ে জমিদার ভৈরব রায়ের নামানুসারে ভৈরবের নামকরণ করা হলেও প্রমত্তা মেঘনা-ব্রক্ষ্মপুত্র যোগে দেশব্যাপী জলপথ আর অসংখ্য খাল বিলসহ দ্বিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠের জন্য ভৈরবের সুখ্যাতি ছিল। নানা ফসল আর বিচিত্র দেশীয় মাছের ভান্ডার হিসেবে সমাদৃত সেই ভৈরব এখন রূপ নিয়েছে কল্পকথায়।

১৯৩৬ সালে প্রজাস্বত্ব আইন জারি হওয়ার পর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত ভৈরবের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও বর্তায় সরকারের ওপর। ফলে ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি ছাড়া খাল-বিলের স্বত্বাধিকারী হয় রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্রের এই সব ভূমি রক্ষার দায়িত্ব বর্তায় থানা ভূমি অফিসের ওপর। যা বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিস নামে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই সরকারি এই অফিসটির কিছু দুর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ক্রমেই দখল হতে থাকে ভৈরবের সরকারি খাল-বিল। ক্রমান্বয়ে সরকারি খাস জলাভূমির মালিক হতে থাকে এলাকার প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা।

ভৈরব উপজেলা ভুমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ভৈরবে এস.এ রেকর্ড ভূক্ত সরকারি খালের ভূমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫৪ একর। এর মধ্যে শ্রেণি পরিবর্তিত হয়ে নীচু ভূমিতে পরিণত হয়েছে প্রায় সোয়া ৬ একর। অভিযোগ রয়েছে, এর পুরোটাই স্থানীয় ভূমি দস্যুদের দখলে চলে গেছে। অবশিষ্ট প্রায় ৪৮ একর খালের ওপর ড্রেজিং এর মাধ্যমে মাটি ভরাট করে দখল করা হয়েছে। ফলে শহর অঞ্চলে জলাভূমির অভাবে মাছের চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সেইসাথে অগ্নিনির্বাপকের জন্য পানির সঙ্কট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার।