শুভ হোক ২০১৪

2014দিন যায়, দিন আসে।এই আসা যাওয়ার পর্বে কালের গর্ভে হারালো আরও একটি বছর।এলো নতুন বছর,২০১৪ খ্রীস্টাব্দ।আগের বছরের শেষ দিকটায় রাজনৈতিক চরম অস্থরতার কারণে জনমনে তেমন স্বস্তি ছিল না। তবে বছরের শুরুর দিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে জেগে ওঠা তারুণ্য জাতির মধ্যে একটা আশার সঞ্চার ঘটিয়ে ছিল।

যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করা এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল বছরজুড়ে। ছিলো প্রাকৃতিক দৃর্যোগও। ঘটে গেছে রানা প্লাজার মতো ট্রাজেডি।রাজনৈতিকঅস্থিরতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও প্রাণহানির ঘটনা ছিল ভয়নক।

যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আন্দোলনে মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক জাগরণের অভাবিত এক আন্দোলন জমে রাজধানীর শাহবাগে।

সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক পুলিশি ধরপাকড়ের শিকার হয়।

ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠা রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের মাত্র পাঁচ দিন আগে বাংলাদেশ প্রবেশ করছে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ে।

যা কিছু মঙ্গলময় তার আগমনের ,তার প্রাপ্তির কামনায় শুরু হোক নতুন বছর এমন কামনা সবার।

তবে আগের বছরের আলোচিত কিছু ঘটনা পাঠকে আবার মনে করিয়ে দিতে ঘুরে আসি বাংলাদেশের ২০১৩ সালে-

শাহবাগ আন্দোলন

ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রত্যাখ্যান করে শাহবাগে তরুণদের একটি সমাবেশ থেকে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় গণজাগরণ। আরব বিশ্বের একনায়কদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক গণআন্দোলন আরব বসন্তের সঙ্গে মিলিয়ে কেউ কেউ একে ডাকতে থাকেন বাংলা বসন্ত নামে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও ‘কসাই কাদের’র সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ফেইসবুকে। ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক নামে একটি সংগঠনের ডাকে শাহবাগে জড়ো হয় কয়েকজন শিক্ষার্থী।

বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে একটি মানববন্ধন হয়। মানববন্ধন শেষে সেখানে হয় একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ।

সমাবেশ শেষ হওয়ার পরে তরুণরা সিদ্ধান্ত নেয় কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা শাহবাগেই অবস্থান করবেন।

নানা ঘটনাপ্রবাহে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা অবস্থান চালিয়ে এই আন্দোলন গড়ে এক নতুন ইতিহাস। ওইদিন সরকারের প্রতি ৬ দফা ঘোষণা করে সমাপ্তি হয় টানা অবস্থানের।

যুদ্ধাপরাধের বিচার

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের মধ্য দিয়ে ‘কলঙ্কমুক্তি’র পথে এগিয়েছে জাতি। এ বছরই মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় প্রথম রায় হয়েছে, প্রথম কোনো যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ও কার্যকর হয়েছে এ সময়েই। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন পলাতক বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে গত ২১ জানুয়ারি শুরু হয় যুদ্ধাপরাধ মামলায় রায়।

এরপর একে একে সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হয় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, পলাতক দুই ছাত্রসংঘ নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের। মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধ করেও বয়সের কারণে ৯০ বছর কারাদণ্ড পান গোলাম আযম।

এ ছাড়া বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড এবং আবদুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

রানা প্লাজা

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ভবন ধসের ঘটনা ঘটে গত ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার মধ্য দিয়ে, যার করুন পরিণতি বিশ্ববাসীকেও বিহ্বল করে। বহুতল এই ভবন ধসে প্রাণ হারান অন্তত এক হাজার ১৩১ জন পোশাক শ্রমিক। নিখোঁজ হন অনেকে, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনো উঠে আসছে যাদের দেহাবশেষ।

বেহাল বিএনপি

বারবার নানা কর্মসূচি দিয়ে সফল করতে না পারার জন্য আগের বছর প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভালো কাটেনি। বছরের নানা সময়ে নানা কারণে আটক হয়েছে দলটির বেশির ভাগ নেতা্ এখনও আটক আছে দলটির প্রথম সারির নেতারা। দলটির যুগ্ম মহাসচিব রিজভীকে গ্রেপ্তারের পর দপ্তরের দায়িত্ব পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদের অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও পাঠানোও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
হেফাজত

ঢাকাকেন্দ্রিক নানা কর্মসূচিতে এ বছরজুড়ে আলোচনায় থাকে কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম, যার নেতৃত্বে রয়েছেন কওমী মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ শফি।

‘নাস্তিক’ ব্লগারদের শাস্তি ও নারীনীতি বাতিলসহ ‘বিতর্কিত’ ১৩ দফা নিয়ে মাঠে নামে তারা।

সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক হিসাবে নিজেদের দাবি করলেও পরে জামায়াত থেকে অর্থ ও লোকবলের মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা নেয়ার অভিযোগ ওঠে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে।

এছাড়া সংগঠনের কমিটিতে স্থান দেয়া হয় ১৮ দলীয় জোটে থাকা ইসলামী মৌলবাদী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের।

১৩ দাবিতে লংমার্চ করে গত ৬ এপ্রিল মতিঝিলে সমাবেশ করে সংগঠনটি, তাতে যোগ দিয়ে সংহতি জানান বিএনপি নেতারা। সংহতি জানায় মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিও।

গত ৫ মে তারা মতিঝিলে সমাবেশ ডেকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায়, যাতে সংঘাতে নিহত হন বেশ কয়েকজন।

বিডিআর বিদ্রোহের বিচার
বিডিআর বিদ্রোহে হত্যাকাণ্ডের বিচারে এ বছর রেকর্ড সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, ঘটনার এক বছরের মধ্যে আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষিত হয়। অর্থপাচার মামলায় তারেকের খালাসও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদরদপ্তরে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়া উপসহকারী পরিচালক তৌহিদুল আলমসহ (৫৫) সীমান্তরক্ষা বাহিনীর ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। গত ৫ নভেম্বর ঘোষিত এই রায়ে আসামিদের ১৬১ জনকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

এছাড়া পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের চলে যাওয়া, এরশাদের রাজনৈতিক নাটক, নিউজিল্যান্ডকে আবারও বাংলা ওয়াশ, আশরাফুলের ম্যাচ ফিক্সিং, ঐশি,  তারানকোসহ আরো বেশ কিছু আলোচ্য বিষয় ছিলো আগের বছর।

তবে পেছনের বছরে আমারা কেবল ফিরে তাকাবো ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিতে যেন আগের বছরের সকল ভুলচুক ঝেরে ফেলে আগামির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারি।