বছরটা বিএনপির ছিলনা

bnp_flag

ছবি: বিএনপি পতাকাদেখতে দেখতে কেটে গেল ২০১৩। চলে যাওয়া এ বছরটি দেশ চরম রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। একদিকে ১৮ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মানবতা বিরোধী অপরাধে বিচার প্রক্রিয়ায় রাখা এবং তাদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে উত্তাল গণজাগরণ মঞ্চ। আরেকদিকে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সরকার পতন ও তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে আন্দোলনের নানা কর্মসূচি দিয়ে থাকলেও কোনটাই সফল করতে পারেনি।তাই বছরটা বিএনপির ছিলনা।

মার্চ ফর ডেমোক্রেসিঃ ২০১৩ সালের শেষ দিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মার্চ ফর ডেমোক্রেসির ঘোষণা দেন। রাজনীতির পাশার দানে বেগম জিয়া তার শেষ ট্রাম কার্ডটি খেলেছেন ২৯ ডিসেম্বরের মার্চ ফর ডেমোক্রেসির কর্মসূচি দিয়ে। কর্মসূচিটি নিয়ে ক্ষমতাসীন আ.লীগের শীর্ষ নেতাদের কপালে ফেলেছিল চিন্তার রেখা। এদিন জাতীয় পতাকা হাতে দেশের বিএনপি সমর্থিত সর্বস্তরের মানুষ নয়াপল্টনে আসার কথা ছিল। বিরোধীদল দেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে এমন আশংকায় ক্ষমাতসীন দলের ব্যাপক প্রতিবন্ধকতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের এ কর্মসূচিটিও সফল হওয়ার পরিবর্তে ব্যর্থ হয়ে গেছে।

দফায় দফায় অবরোধ হরতালঃ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অক্টোবরের শেষের দিক থেকে ডিসেম্বরের শেষ অবধি বিএনপি দফায় দফায় হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দিয়ে আসছিল। দফায় দফায় দেওয়া এসব কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় নাশকতা মূলক কর্মকান্ড চালিয়েছে। এসব নাশকতায় প্রাণ হারিয়েছে দলটির ও প্রতিপক্ষ আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরাসহ শতাধিক সাধারণ মানুষ। দেশের পুলিশ প্রশাসন এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে বিএনপির শীর্ষ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এবং দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলামসহ ১৬ জন শীর্ষ নেতাকে কারাগারে পাঠায়। তাদের মুক্তির দাবিসহ অন্যান্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বছরের শেষ দু’মাসে পাঁচ দফা অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। দলটির অংগসংগঠন ছাত্রদল, যুবদল, শ্রমিক দলকে বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকান্ড থেকে দমিয়ে রাখতে বিভিন্ন মামলার আসামি করে ছাত্রদল সভাপতি জুয়েলসহ দলটির শীর্ষ নেতাকর্মীদের কারাগারে পাঠায় পুলিশ। সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের কারণে বছরের শেষ দিকটা গ্রেপ্তার আতঙ্কে কাটিয়েছে দলটির শীর্ষ নেতাকর্মীরা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদরা গ্রেপ্তার আতঙ্কে এতটাই তটস্থ ছিলেন যে তারা গণমাধ্যমে অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে দলের কর্মসূচি জানিয়েছেন। ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এসব কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে গ্রেপ্তার আতংকে মাঠে নামেননি তারা কেউই। এদিকে নভেম্বরের শেষ দিকে দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থাকে তোয়াক্কা না করেই নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করায় এই একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করতে জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের ভোটকেন্দ্রে দূর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বেগম জিয়া। এছাড়া গত দুমাসে সারাদেশে একযোগে বেশ অনেকবার হরতাল আহ্বান করেছে দলটি। যার কোনটাই তেমন ফলপ্রসুতার সাথে সফল করতে পারেনি ১৮ দল। তাই এ দুটি মাসও বিএনপির জন্য সময়টা ভাল কাটেনি।

হেফাজত..শাপলা চত্বরঃ ২০১৩ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার প্রতিবাদে ১৩ দফা দাবি নিয়ে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সমাবেশ ও অবস্থান নিয়েছিল। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে ঐদিন দলটির সেই কর্মসূচিটিও পণ্ড হয়ে যায়। বিএনপি আশা করেছিল হেফাজতের এই কর্মসূচি সরকার পতন আন্দোলনে তাদের সিড়ি হবে। সেদিন শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে যৌথবাহিনীর অভিযানে ৩৯ জন নিহত হয়েছে। অভিযানের পর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত ‘মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এ কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ আমরুল ইসলাম আর সদস্য সচিব ছিলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। ‘হেফাজত-জামায়াতের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ৪০০ দিন’ নামে একটি শ্বেতপত্রের মোড়ক উন্মোচন করে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। শ্বেতপত্রে এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

চল চল ঢাকা চলঃ মহাজোট সরকারকে বিদায় করতে ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ‘চল চল, ঢাকা চল’র কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ৮ জানুয়ারি ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই রোডমার্চটি চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে শেষ হয়েছিল। ১২ মার্চের কর্মসূচিটি সফল ও নেতাকর্মীদের স্বতস্ফুর্ততা বাড়াতে বেগম জিয়া চার মাসে চারটি রোডমার্চ শেষে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দেন। এই ঢাকা চল কর্মসুচিও সরকারি দলের ব্যাপক প্রতিরোধের কারণে সফলতার মুখ দেখেনি।

রাজনৈতিক এসব পরিসংখ্যানই পরিস্কার করে দেয় সব মিলিয়ে চলে যাওয়া বছরটি বিএনপির ছিলনা।